২০২৬-২৭ অর্থবছরে মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে রোগীদের খাবার সরবরাহের প্রায় দুই কোটি টাকার টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে সর্বনিম্ন দরদাতার প্রস্তাবের তুলনায় ১৫ লাখ ৭২ হাজার ৮২১ টাকা ৮৯ পয়সা বেশি মূল্যে চুক্তি হয়েছে। অন্যদিকে রোগীদের দৈনিক পথ্য বাবদ ১৭৫ টাকার বরাদ্দ অপরিবর্তিত থাকলেও খাদ্যতালিকায় পেঁপে, সবজি, আলু, ডাল, মাছ ও মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের পরিমাণ কমানো হয়েছে। কোনো কোনো পণ্যের বরাদ্দ কমেছে প্রায় ৬৮ শতাংশ। সকালের নাস্তা থেকে বাদ পড়েছে চিনিও। সব মিলিয়ে হাসপাতালের খাদ্য সরবরাহের টেন্ডার প্রক্রিয়া ও রোগীদের খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে পাওয়া দরপত্রের নথি, চুক্তিপত্র এবং বিগত অর্থবছরগুলোর অনুমোদিত খাদ্যতালিকা বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
দরপত্রের নথি অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রোগীদের খাবার ও আনুষঙ্গিক সেবা সরবরাহের জন্য দুই কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়। টেন্ডার আইডি ১৩০৮২৫৭ এবং প্যাকেজ নম্বর Meher/e-Tender/2026-27-GD-9-এর বিপরীতে তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব জমা দেয়।
এর মধ্যে আদিল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ১ কোটি ৮০ লাখ ৪০ হাজার ৫৯২ টাকা দর প্রস্তাব করে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ওয়েলনেস ট্রেডিং প্রস্তাব করে ১ কোটি ৯৬ লাখ ১৩ হাজার ৪১৩ টাকা ৮৯ পয়সা। তৃতীয় প্রতিষ্ঠান মাস্টার মাইন্ড ইনকর্পোরেশনের দর ছিল ১ কোটি ৯৮ লাখ ১৬ হাজার ৭৭৪ টাকা ৬৫ পয়সা।
তবে সর্বনিম্ন দরদাতা আদিল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ওয়েলনেস ট্রেডিংকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি রেফারেন্স নম্বর MGH/Meherpur/Diet/Agreement/2026-27/998 অনুযায়ী, গত ১৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. সাজ্জাত হাসান এবং ওয়েলনেস ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী ওয়ায়েস খানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির মূল্য ১ কোটি ৯৬ লাখ ১৩ হাজার ৪১৩ টাকা ৮৯ পয়সা।
হিসাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন দরদাতার তুলনায় চুক্তিমূল্য ১৫ লাখ ৭২ হাজার ৮২১ টাকা ৮৯ পয়সা বেশি। তবে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দেওয়ার কারণ জানতে মূল্যায়ন প্রতিবেদন, যোগ্যতা যাচাই ও অনুমোদনসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন। বিধি অনুযায়ী, সর্বনিম্ন দরদাতা বাধ্যতামূলক শর্ত বা যোগ্যতা পূরণে ব্যর্থ হলে পরবর্তী দরদাতাকে বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রথম প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যার দাবি উঠেছে।
১৭৫ টাকার বাজেটে খাবার কমেছে ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত দরপত্রের পাশাপাশি ২০২৪-২৫, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অনুমোদিত খাদ্যতালিকা তুলনা করে দেখা গেছে, রোগীপ্রতি দৈনিক পথ্য বাবদ ১৭৫ টাকার বরাদ্দ অপরিবর্তিত থাকলেও খাদ্যপণ্যের দর বেড়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন পণ্যের বরাদ্দ কমানো হয়েছে।
নতুন খাদ্যতালিকায় সকালের নাস্তায় ডিমের সংখ্যা একটি থাকলেও দাম ১২ টাকা থেকে বেড়ে ২৩ টাকা হয়েছে। দুটি কলার পরিবর্তে একটি কলা দেওয়া হচ্ছে। কলার একক দর ৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৬ টাকা হয়েছে। পাউরুটির দাম প্রতি কেজি ২৬০ টাকা থেকে বেড়ে ২৭৫ টাকা হলেও বরাদ্দ ৮০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৭০ গ্রাম করা হয়েছে। আগের তালিকায় থাকা ১০ গ্রাম চিনিও নতুন তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
দুপুর ও রাতের খাবারে চালের দৈনিক বরাদ্দ ৪০০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৩৪০ দশমিক ৩ গ্রাম করা হয়েছে। মসুর ডালের বরাদ্দ ২৫ গ্রাম থেকে কমে হয়েছে ১৪ গ্রাম, অথচ কেজিপ্রতি দাম ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৭৮ টাকা হয়েছে। খাসির মাংসের বরাদ্দ ৭০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৬০ গ্রাম করা হয়েছে। রুই মাছের বরাদ্দ ২৩৩ দশমিক ৩৩ গ্রাম থেকে কমে হয়েছে ২০১ গ্রাম। সিলভার কার্প ও গ্রাসকার্পের বরাদ্দ ২৮০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ২৪০ দশমিক ৯ গ্রাম এবং পাঙ্গাস মাছের বরাদ্দ ৩১৮ দশমিক ১৮ গ্রাম থেকে কমিয়ে ২৭৩ দশমিক ৮ গ্রাম করা হয়েছে।
সবজির বরাদ্দেও বড় ধরনের কাটছাঁট দেখা গেছে। পটল, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও কাঁচা কলার মতো সবজির দৈনিক বরাদ্দ ৪৫৯ গ্রাম থেকে কমিয়ে ১৭৮ দশমিক ৫ গ্রাম করা হয়েছে। এতে কমেছে ৬১ দশমিক ১১ শতাংশ। পেঁপের বরাদ্দ ১৩১ দশমিক ১৪ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৪১ দশমিক ২ গ্রাম করা হয়েছে, যা ৬৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। আলুর বরাদ্দ ৫৭ দশমিক ২৫ গ্রাম থেকে কমিয়ে ২৫ গ্রাম করা হয়েছে। সিম ও মিষ্টি কুমড়ার বরাদ্দ ৯১৮ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৩৫২ দশমিক ১ গ্রাম করা হয়েছে।
অন্যদিকে সয়াবিন তেলের দৈনিক বরাদ্দ ১২ গ্রাম থেকে কমিয়ে ১০ গ্রাম করা হয়েছে। এর লিটারপ্রতি দাম ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২৭৫ টাকা হয়েছে।
খাদ্যতালিকার এই তুলনায় দেখা যায়, পাকা কলার দাম বেড়েছে প্রায় ১৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ডিমের ৯১ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং মসুর ডালের ৪৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অথচ বিভিন্ন খাদ্য উপাদানের পরিমাণ কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে।
চিকিৎসাধীন রোগীদের সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত ও সুষম খাবার গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডিম, মাছ, মাংস, ডাল, শাকসবজি ও ফলমূল শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাতে ভূমিকা রাখে। রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন হতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে বরাদ্দ কমানোর ফলে রোগীদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা পর্যালোচনা করা জরুরি।
স্থানীয় সচেতন মহল ও স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীদের মতে, বর্তমান বাজারদরে ১৭৫ টাকার দৈনিক পথ্য বাজেট দিয়ে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত খাবার সরবরাহ করা কঠিন। তাঁদের দাবি, রোগীদের পুষ্টির চাহিদা বিবেচনায় বরাদ্দ পুনর্নির্ধারণের পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, ব্যাখ্যা চান সংশ্লিষ্টরা
ওয়েলনেস ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী ওয়ায়েস খানের বিরুদ্ধে সাবেক হাসপাতাল সুপার ডা. শায়লা শারমিনের নিকটাত্মীয় হওয়ার সুবাদে টেন্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে সুপারিশ ও প্রভাব কাজে লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগটির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ায়েস খান বলেন, “আমি এসব বিষয় দেখি না। আপনি দায়িত্বপ্রাপ্ত অথরিটির সঙ্গে কথা বলেন।” আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং টেন্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সুপারিশ বা প্রভাব ছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. নাসিম আখতার বলেন, টেন্ডার অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদনের সময় তিনি মেহেরপুরে কর্মরত ছিলেন না। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর খাদ্য সরবরাহের মূল্যতালিকা পর্যালোচনা করে কয়েকটি পণ্যের মূল্য তুলনামূলক বেশি দেখেছেন।
তিনি বলেন, “সংশ্লিষ্ট খাদ্য সরবরাহকারীকে ডেকে রোগীদের খাবারের মান ও নির্ধারিত পরিমাণ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছি। বাজারমূল্য বা সরবরাহমূল্য যাই হোক না কেন, রোগীদের খাবারের পরিমাণ ও মানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও আমাকে আশ্বস্ত করেছে যে, পূর্বনির্ধারিত পরিমাণ ও মান অনুযায়ী খাবার সরবরাহে কোনো ঘাটতি হবে না।”
মেহেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. একেএম আবু সাঈদ বলেন, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল তাঁর সরাসরি প্রশাসনিক অধিক্ষেত্রের আওতাভুক্ত নয়। হাসপাতালটির প্রশাসনিক কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হয়।
তিনি আরও বলেন, “হাসপাতালের খাদ্য সরবরাহ, টেন্ডার প্রক্রিয়া কিংবা রোগীদের খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনব এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করব।”
প্রায় দুই কোটি টাকার খাদ্য সরবরাহের চুক্তিতে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দেওয়ার কারণ, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ এবং রোগীদের খাদ্যতালিকায় বড় ধরনের কাটছাঁটের যৌক্তিকতা—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা খাবারের প্রকৃত পরিমাণ ও মান নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি এখন গুরুত্বপূর্ণ।
পড়ুন : রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সা/


