গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সীমান্তবর্তী জনপদ নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের কাছে উচ্চশিক্ষা আজও এক বড় সংগ্রামের নাম। বিশেষ করে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর দূরদূরান্তে গিয়ে পড়াশোনা করার সামর্থ্য না থাকায় প্রতিবছর অসংখ্য সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের ইতি টানতে হয়। এবার অবহেলিত এই জনপদের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের সেই আক্ষেপ ঘোচাতে এবং উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে এক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের বিদ্যাপীঠ ‘নাজিরপুর পল্লী জাগরণ উচ্চ বিদ্যালয়’-কে উচ্চ মাধ্যমিক তথা কলেজে উন্নীত করার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের কাছে এ সংক্রান্ত একটি আধা-সরকারি পত্র (ডিও লেটার) প্রদান করেছেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
নাজিরপুর এবং এর আশেপাশের সুবিশাল সমতল ও সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘকাল ধরে কোনো মানসম্মত উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কলেজ নেই। ফলে প্রতিবছর এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও সাধারণ পরিবারের হাজার হাজার শিক্ষার্থী চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। পারিবারিক আর্থিক অসচ্ছলতা এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দূরবর্তী শহরে গিয়ে কলেজে ভর্তি হওয়া অনেকের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে নারী শিক্ষার্থীরা; নিরাপদ যাতায়াত ও আবাসনের অভাবে অঙ্কুরেই ঝরে পড়ে শত শত মেধাবী ছাত্রীর স্বপ্ন।
শিক্ষামন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় নিজের নির্বাচনী এলাকার নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর) বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, “গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জনপদটি শিক্ষা-দীক্ষায় অনুন্নত ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে অবহেলিত একটি অঞ্চল। এখানে সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সীমাহীন সংগ্রামের ফলে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীকে তাদের শিক্ষাজীবনের ইতি টানতে হয়।”
সুদীর্ঘ কাল ধরে নাজিরপুর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে নাজিরপুর পল্লী জাগরণ উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠটি দীর্ঘ প্রায় ছয় থেকে সাত দশক ধরে অত্যন্ত সুনাম ও নিষ্ঠার সাথে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করে আসছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টির রয়েছে সুবিশাল ক্যাম্পাস, উন্নত ভৌত অবকাঠামো এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, যা একটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চ মাধ্যমিক স্তর বা কলেজ পরিচালনার জন্য সম্পূর্ণ উপযোগী।
এর আগে গত ২৯ অক্টোবর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আতাউর রহমান খান এবং ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. আনিসুল ইসলাম যৌথভাবে স্বাক্ষরিত আবেদনপত্রে ডেপুটি স্পিকারের কাছে সীমান্তবর্তী এই এলাকার শিক্ষার্থীদের স্বার্থে বিদ্যালয়টিতে মানবিক ও বিজ্ঞান শাখার সমন্বয়ে কলেজ শাখা চালুর সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এলাকাবাসী ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সেই প্রাণের দাবিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার প্রদান করলেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। চিঠিতে তিনি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত অসংখ্য পরিবারের সন্তানদের গুণগত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে মানবিক ও বিজ্ঞান শাখার সমন্বয়ে বিদ্যালয়টিকে কলেজে উন্নীত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন। শুধু কলেজে উন্নীতকরণের উদ্যোগই নয়, প্রতিষ্ঠানটিকে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তুলতেও ইতিমধ্যে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছেন ডেপুটি স্পিকার।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. আনিসুল ইসলাম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “দুর্গাপুর-কলমাকান্দার শ্রদ্ধাভাজন অভিভাবক ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল মহোদয়ের কাছ থেকে এমন বড় পাওয়া আমাদের জন্য সত্যিই গর্বের এবং আনন্দের। এলাকার শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণের কথা ভেবে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এই প্রতিষ্ঠানের জন্য আধুনিক আইসিটি ল্যাব, ডিজিটাল ক্লাসরুম এবং ডিজিটাল হাজিরা ডিভাইস স্থাপনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এটি প্রমাণ করে আমাদের প্রিয় নেতা শুধু একজন মানবিক নেতাই নন, বরং সুশিক্ষিত সমাজ গঠনে একজন সমৃদ্ধ মানসিকতার অধিকারী সুযোগ্য নেতৃত্ব।”
তিনি এই মহৎ উদ্যোগে সার্বিক সহযোগিতার জন্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আতাউর রহমান খান, সহকারী প্রধান শিক্ষকগণ এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সাথে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর আন্তরিক সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রত্যাশা করেন তিনি।
ডেপুটি স্পিকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নাজিরপুর ইউনিয়নসহ পুরো কলমাকান্দা উপজেলায় আনন্দের জোয়ার বইছে। স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নাজিরপুরবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হবে। ঘরের কাছেই স্বল্প খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলে ঝরে পড়ার হার যেমন শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে, তেমনি গারো পাহাড়ের পাদদেশের পিছিয়ে পড়া জনপদটি শিক্ষা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে।
পড়ুন : মহেশপুর সীমান্তের ধানখেত থেকে অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধার


