ভালোবেসে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। বাস্তবতার রূঢ় সমীকরণ আর পারিবারিক চাপের মুখে সেই ঘর টেকেনি। বিচ্ছেদের কাগজে সই করে আলাদা হয়ে গিয়েছিল দুজনের পথ। তবু শেষ পর্যন্ত যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা রইল তাদের নিয়তি। তালাকের মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিনের মাথায়, আট থেকে নয় ঘণ্টার ব্যবধানে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন প্রাক্তন স্বামী-স্ত্রী। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে মোহনগঞ্জ থানা প্রাঙ্গণে যখন দুটি অ্যাম্বুলেন্সে তাদের নিথর দেহ তোলা হচ্ছিল, তখন সেখানে তৈরি হয় হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
মৃত দুজন হলেন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর ইউনিয়নের আটবাড়ি গ্রামের সুনো মিয়ার ছেলে মো. সাকিব মিয়া (২৩) এবং একই উপজেলার তেতুলিয়া ইউনিয়নের ফাগুয়া গ্রামের বাবুল মিয়ার মেয়ে মুক্তা আক্তার (১৯)। সম্পর্কে তারা মামাতো-ফুফাতো ভাই-বোন ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পেশায় দিনমজুর সাকিব মিয়া কখনো কৃষিকাজ করতেন, আবার কখনো হাওরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সংসারে তার স্ত্রী ও আড়াই বছর বয়সী এক সন্তান রয়েছে; প্রথম স্ত্রী বর্তমানে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
এরই মধ্যে মামাতো বোন মুক্তা আক্তারের সঙ্গে সাকিবের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রায় তিন মাস আগে তারা বিয়ে করেন। সাকিবের আগের সংসার ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর বিষয়টি সামনে আসায় দুই পরিবারেই শুরু হয় তীব্র কলহ। পারিবারিক চাপের মুখে টিকতে না পেরে মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিন আগে মুক্তাকে তালাক দিতে বাধ্য হন সাকিব। বিচ্ছেদের পর মনভাঙা মুক্তা চলে যান গাজীপুরের শ্রীপুরে, তার বাবার কর্মস্থলের বাসায়।
বিচ্ছেদের পর থেকেই দুজন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলে ধারণা স্থানীয়দের। গতকাল (সোমবার) সন্ধ্যায় গাজীপুরের শ্রীপুরে বাবার বাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে মারা যান মুক্তা আক্তার। আইনি ঝামেলার আশঙ্কায় তার বাবা বাবুল মিয়া স্থানীয় পুলিশকে কিছু না জানিয়ে রাতের আঁধারেই মেয়ের মরদেহ নিয়ে চলে আসেন মোহনগঞ্জের ফাগুয়া গ্রামের বাড়িতে। আজ মঙ্গলবার সকালে সেখানে গোপনে দাফনের প্রস্তুতি চলছিল।
ঠিক একই সময়ে, কয়েক কিলোমিটার দূরের আটবাড়ি গ্রামে ঘটে আরেক ট্র্যাজেডি। মুক্তার মৃত্যুর খবর পেয়েই কি না, তা কেউ নিশ্চিত বলতে না পারলেও গতকাল রাতের কোনো এক সময় নিজ ঘরের বারান্দায় গলায় ফাঁস দেন সাকিব। আজ সকালে পরিবারের লোকজন তার ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান।
একদিকে ফাগুয়া গ্রামে মুক্তার দাফনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে আটবাড়ি গ্রামে সাকিবের ঝুলন্ত দেহ- দুই গ্রামের এই খবর দ্রুতই পৌঁছে যায় মোহনগঞ্জ থানায়। পুলিশ গিয়ে দুই গ্রাম থেকে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
গাগলাজুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য কাজী লুৎফর রহমান বলেন, ‘সাকিব খেটে খাওয়া মানুষ ছিলেন। নিজের স্ত্রী-সন্তান থাকার পরও কিছুদিন আগে আরেকটি বিয়ে করেন এবং পরে তালাকও দেন। গতকাল মেয়েটি মারা গেছে, আর আজ সকালে সাকিবের লাশ পাওয়া গেল। বিয়ে ও বিচ্ছেদের মানসিক চাপ থেকেই এমনটা ঘটেছে কি না, তা স্পষ্ট করে বলা কঠিন, তবে ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’
মোহনগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রবিউল আওয়াল জানান, সুরতহাল প্রতিবেদনে দুজনের কারোরই শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক আলামত দেখে মনে হচ্ছে, বিচ্ছেদ জনিত হতাশা ও মানসিক চাপ থেকেই তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।
মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, ‘মুক্তা শ্রীপুরে মারা গেলেও তার বাবা পুলিশকে না জানিয়ে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন। খবর পেয়ে আমরা দাফনের আগেই মরদেহ উদ্ধার করি। একই সময়ে সাকিবের মরদেহও উদ্ধার করে থানায় আনা হয়। পরে দুটি আলাদা অ্যাম্বুলেন্সে করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ দুটি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নেত্রকোনা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।’
ওসি আরও জানান, মুক্তার মৃত্যুর বিষয়টি গাজীপুরের শ্রীপুর থানা-পুলিশকে অবহিত করা হবে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পরিবারের পক্ষ থেকেই লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। আপাতত থানায় পৃথক অপমৃত্যুর মামলা রুজু করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
অসময়ে দুটি তাজা প্রাণের এমন আকস্মিক প্রস্থানে আটবাড়ি ও ফাগুয়া- দুই গ্রামেই এখন শোকের ছায়া। সাকিবের প্রথম স্ত্রী ও অবুঝ সন্তানটির ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্বজনেরা।
পড়ুন : চারদিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধের খবর গুজব : পেট্রোবাংলা


