ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে টানা কয়েক দিনের আন্দোলন ও সহিংস ঘটনার পর গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল থেকে পোশাকশ্রমিকরা দলবেঁধে নিজ নিজ কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছেন। সকাল ৮টা পর্যন্ত জেলার ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কসহ আঞ্চলিক কোনো সড়কে শ্রমিকদের পিকেটিং বা অবস্থান কর্মসূচি দেখা যায়নি। তবে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শিল্পাঞ্চলের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁদের নেতৃত্বে বিজিবির ১২ প্লাটুন, আনসারের ৫ প্লাটুন এবং এসআরবির ৮ প্লাটুনসহ মোট ২৫ প্লাটুন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মো. আরিফ হোসাঈন। তিনি জানান, আন্দোলনের নামে যাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং সাধারণ মানুষের জানমালের কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয়, সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত টহল ও তদারকি জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন।
এর আগে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলন করে আসছিলেন। একপর্যায়ে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় পুলিশ বক্স, পুলিশের গাড়ি এবং কয়েকটি কারখানার গুদামে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এসব ঘটনায় শ্রমিক ও পুলিশ সদস্য আহত হন। পাশাপাশি বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে একাধিক পোশাক কারখানা কর্তৃপক্ষ সাময়িক ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। ফলে শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ে। তবে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শ্রমিকদের কাজে ফেরার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সড়কগুলোতে নতুন করে অবরোধ বা পিকেটিং না থাকায় যান চলাচলও স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে তৈরি পোশাকশিল্পে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করার কথা জানানো হয়েছে। আর জানুয়ারি থেকে শ্রমিকরা বাড়তি বেতন হাতে পাবেন বলে জানিয়েছেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বোর্ডের প্রথম সভা শেষে এ তথ্য জানান মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এ বি এম শামসুদ্দিন এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার। সভায় সভাপতিত্ব করেন মজুরি বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানী।
সভা শেষে প্রতিনিধিরা জানান, নতুন মজুরি কাঠামো ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শ্রমিকরা জানুয়ারি মাস থেকে বাড়তি বেতন হাতে পাবেন। নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পোশাকশ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়ে অগ্রগতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ খাতে লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ন্যূনতম মজুরি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
গাজীপুরের সাম্প্রতিক আন্দোলনের পর শ্রমিকদের কাজে ফিরে আসাকে শিল্পাঞ্চলের জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে দাবি ও প্রত্যাশার বিষয়টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের অসন্তোষ কমবে কি না, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং তার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
এদিকে শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
পড়ুন:ইরান যুদ্ধের কারণেই নির্বাচনে হার, স্বীকার করলেন ট্রাম্প
ইমি/


