যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক পরাজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইরানের রাজধানী তেহরানে উল্লাস করেছেন হাজার হাজার মানুষ। বুধবার দেশটির সাবেক মার্কিন দূতাবাসের সামনে আয়োজিত বার্ষিক যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সমাবেশে অংশ নিয়ে তাঁরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সমাবেশে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ ও ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল ও কূটনীতিকদের জিম্মি করার ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে প্রতিবছর এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। তবে এবারের আয়োজনের রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল ভিন্ন। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়কে নিজেদের জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক স্বস্তি হিসেবে দেখছেন অনেক ইরানি।
সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা ইরানের জাতীয় পতাকা নাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন ব্যানার প্রদর্শন করেন। একটি বড় ব্যানারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শিকলে বাঁধা রক্তমাখা বুলডগ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। সেই শিকলের অন্য প্রান্তে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো দেখতে শয়তানের অবয়বের একটি চরিত্র দেখানো হয়েছে।
অন্য ব্যানারগুলোতে ইরানের নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় তিনি নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই হামলার পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।
সমাবেশস্থলে প্রদর্শিত আরেকটি বিশাল ব্যানারে লেখা ছিল, ‘মূল্য কত হবে, তা নির্ধারণ করেছে ইরানের জনগণ।’ এর পাশে বিশ্বের মানচিত্রের ওপর সারি সারি কালো তেলের ড্রাম সাজিয়ে রাখা হয়। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকট এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়।
তেহরানের ৪০ বছর বয়সী বাসিন্দা মাহমুদখানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে ইরানের ওপর চাপ ও অত্যাচার চালিয়ে আসছে। কিন্তু তাতে ইরানকে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানিরা যে অর্থনৈতিক দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, এবার জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে অন্য দেশের মানুষও সেই সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।
তিনি বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা আনন্দিত নন। তবে এত দিন কেবল ইরানের মানুষই অর্থনৈতিক কষ্ট ভোগ করেছেন। এখন অন্য দেশের জনগণকেও একই ধরনের দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এতে কিছুটা হলেও তৃপ্তি অনুভব করছেন তাঁরা।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই নৌপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে। এতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
তেহরানের ৬২ বছর বয়সী কাপড় ব্যবসায়ী মজিদ হেইদারি মনে করেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ একজোট হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তেহরানও নিজেদের হাতে থাকা কৌশলগত শক্তি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে।
হেইদারি বলেন, অন্য দেশের জনগণকে অর্থনৈতিক দুর্ভোগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে তাদের সরকারের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা ছাড়া ইরানের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেই সাধারণ ইরানিদের জীবনে বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, এমনটা মনে করেন না তিনি।
ইরানের সরকারি কর্মকর্তা মোহাম্মদও একই ধরনের সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট কিংবা রিপাবলিকান—যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, ইরানের প্রতি দেশটির নীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। গত পাঁচ দশক ধরে ইরানের জনগণের প্রতি মার্কিন সরকারের বৈরী মনোভাব একই রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তেহরানের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াও এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ নির্বাচনে মার্কিন জনগণের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, বিবেকের তাড়নায় হোক কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার কারণে হোক, মার্কিন জনগণ স্পষ্টভাবে যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ইরান তাদের এই বার্তাকে পূর্ণ সমর্থন জানায়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফলাফল দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা কাটেনি। ফলে আলোচনায় এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও দেখা যায়নি।
তেহরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বাঘেরিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের চিরশত্রু। হোয়াইট হাউসে কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় রয়েছে, সেটি ইরানের মানুষের কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী পরাজয় তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব প্রকাশের নতুন উপলক্ষ তৈরি করেছে। ইরানিরা এই ফলাফলকে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধনীতি ও অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের অসন্তোষ হিসেবে দেখছেন। তবে নির্বাচনে রাজনৈতিক পালাবদল হলেও ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের দীর্ঘদিনের বৈরিতা কতটা কমবে, সে বিষয়ে এখনো আশাবাদী হতে পারছেন না তাঁরা।
পড়ুন:আরব দলগুলো নিয়ে নেতানিয়াহুর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান নির্বাচন কমিশনের
ইমি/


