সবুজ মাচার নিচে সারি সারি ঝুলছে সতেজ শসা। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে ও আগাছা রোধে ক্ষেতের বেডে বিছানো হয়েছে আধুনিক মালচিং পেপার, আর পোকামাকড় দমনে ঝুলছে হলুদ আঠালো ফাঁদ (ইয়েলো স্টিকি বোর্ড) ও ফেরোমন ট্র্যাপ। মাঠের একপাশে চলছে পলিথিন শেডের নিচে শীতকালীন সবজির নিবিড় পরিচর্যা, অন্যপাশে ডালপালা মেলেছে বল সুন্দরী আপেল কুল ও ব্যানানা ম্যাঙ্গোর বাগান। সঙ্গে রয়েছে উন্নত জাতের গাভির খামার ও পুকুরে মাছ।
পট বদলে দেওয়া আধুনিক ও সমন্বিত কৃষি কর্মযজ্ঞের কারিগর নেত্রকোনা সদর উপজেলার সিংহের বাংলা ইউনিয়নের ধীতপুর গ্রামের শিক্ষিত তরুণ মো. মহিদুল হাসান মুন্না। যেখানে উচ্চশিক্ষা শেষ করে বেশিরভাগ তরুণই একটি সরকারি বা বেসরকারি চাকরির পেছনে হন্যে হয়ে ছুটছেন, সেখানে স্রোতের বিপরীতে হাঁটার সাহস দেখিয়েছেন মুন্না। নিজের মেধা, একাগ্রতা ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে গড়ে তুলেছেন আদর্শ কৃষি সাম্রাজ্য, যা আজ পুরো এলাকার তরুণ ও কৃষকদের কাছে অনুপ্রেরণার নাম।
কৃষক বাবার সন্তান মো. মহিদুল হাসান মুন্না দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড়। নেত্রকোনা সরকারি কলেজ থেকে ইতিহাস বিভাগে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করে বর্তমানে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল স্বাধীনভাবে কিছু করার, নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার।
দাদার আমল থেকে পাওয়া পৈতৃক সূত্রে প্রায় ২০ একর জমি রয়েছে তাদের। মুন্না ভাবলেন, পৈতৃক সম্পত্তিকে সনাতন পদ্ধতিতে ফেলে না রেখে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কীভাবে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো যায়। সেই ভাবনা থেকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন কৃষি নিয়ে কাজ করার। তবে হুট করে মাঠে নামেননি তিনি। কৃষির বিভিন্ন খাত যেমন সবজি চাষ, ফল বাগান, গবাদিপশু পালন ও মৎস্য চাষ নিয়ে প্রথমে বিস্তারিত পড়াশোনা ও গবেষণা করেন। এরপর আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে বাস্তবিক অর্থেই নিজের স্বপ্নের প্রকল্পে হাত দেন এই তরুণ।
মুন্নার পুরো প্রকল্পটি মূলত একটি ‘সমন্বিত কৃষি খামার’। তার এই খামারে বছরজুড়েই চলে নানা ফসলের আবর্তন। বর্তমানে প্রায় ৩০০ শতাংশ (স্থানীয় হিসাবে ৩০ কাঠা, যেখানে ১০ শতাংশে এক কাঠা) জমিতে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন সবজির আবাদ হচ্ছে।
একই জমিতে সারা বছর পর্যায়ক্রমে উচ্চমূল্যের ফসল চাষ করে মুন্না চমকপ্রদ সাফল্য পেয়েছেন। মাত্র ৪০ শতাংশের একটি প্লটে গত জানুয়ারি মাসের দিকে চাষ করেছিলেন উচ্চমূল্যের সবজি ক্যাপসিকাম ও নাগা মরিচ। অতিবৃষ্টির কারণে কিছু গাছ নষ্ট হলেও ক্যাপসিকাম থেকে সব খরচ বাদ দিয়ে তার নিট লাভ হয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। ক্যাপসিকাম তোলার পর মে মাসের শেষের দিকে ওই একই জমিতে বর্ষাকালীন (অফ-সিজন) দেশি লাউ চাষ করেন। এতে তার খরচ হয়েছিল মাত্র ৪০ হাজার টাকা, আর সব খরচ বাদ দিয়ে নিট মুনাফা আসে এক লাখ ১০ হাজার টাকা।
লাউয়ের পর বর্তমানে সেই ৪০ শতাংশ জমিতে মাচায় চাষ হচ্ছে শসা। প্রতি দুই দিন পরপর ক্ষেত থেকে শসা তোলা হচ্ছে এবং ইতিমধ্যে পাঁচ মণ করে শসা ২৫ থেকে ৩৫ টাকা কেজি পাইকারি দরে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। শসা ও করলার পাশাপাশি বর্তমানে ক্ষেতে শিম রয়েছে এবং নতুন করে টমেটো, কাঁচা মরিচ ও বেগুনের প্রজেক্ট প্রস্তুত করা হচ্ছে। এছাড়া তার খামারে পেঁপে গাছও রয়েছে এবং সমন্বিত এই খামারের সীমানার চারদিকে বেষ্টিত রয়েছে দুই হাজারের বেশি দেশি জাতের কলা গাছ।
ফলের বাগানেও মুন্না এনেছেন বৈচিত্র্য। নতুন করে ৫০ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তুলেছেন সুমিষ্ট ‘ব্যানানা ম্যাঙ্গো’ বা কলা আমের বাগান এবং ৩০ শতাংশ জমিতে করেছেন ‘বল সুন্দরী’ ও আপেল কুলের বাগান, যার গাছগুলোতে ইতিমধ্যে থোকায় থোকায় কুল দুলছে।
কৃষির পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে ছোট-বড় মিলিয়ে সাতটি গরু নিয়ে গবাদিপশুর খামার শুরু করেছেন মুন্না। এখানে দেশি জাতের পাশাপাশি উন্নত ফ্রিজিয়ান জাতের গাভি রয়েছে। তিনটি গাভির মধ্যে বর্তমানে দুধ দিচ্ছে এমন গাভি থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ লিটার দুধ পাওয়া যাচ্ছে।
সমন্বিত খামার হওয়ায় গবাদিপশুর খাবার নিয়ে তাকে বাড়তি দুশ্চিন্তায় পড়তে হয় না। নিজের জমির খড়, ধানের কুঁড়া এবং খামারে উৎপাদিত কাঁচা ঘাসেই মিটে যায় গরুর প্রধান খাদ্যের চাহিদা। বাইরে থেকে কেবল দানাদার খাবারটুকুই কিনতে হয়। এছাড়া পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও জৈব সারের জোগান দিতে খামারে রয়েছে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট।
মুন্না কেবল নিজের খামারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; এলাকার কৃষকদের এনালগ বা সনাতন পদ্ধতি থেকে বের করে ডিজিটাল ও আধুনিক এবং বিষমুক্ত কৃষিতে অভ্যস্ত করতে গড়ে তুলেছেন ‘এগ্রোসোমা’ (agrosoma.com) নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট।
এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি চারা উৎপাদনের আধুনিক সরঞ্জাম যেমন সিডলিং ট্রে, কোকোপিট, শেড নেট এবং আধুনিক স্প্রে মেশিন ও কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেন। বিষমুক্ত ও নিরাপদ সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যে জৈব বালাইনাশক, নিম তেল, ইয়েলো স্টিকি বোর্ড ও ফেরোমন ট্র্যাপের মতো অর্গানিক পণ্য বিক্রি করেন তিনি।
নিজের খামারে মালচিং পেপার ও জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি আশপাশের কৃষকদের হাতে-কলমে দেখিয়ে দিচ্ছেন কীভাবে অল্প সময়ে ও কম খরচে অধিক লাভবান হওয়া যায়। অনলাইন ও অফলাইনে কৃষি উপকরণ বিক্রি করে ইতিমধ্যে দারুণ সাড়া পেয়েছেন মুন্না। শুধুমাত্র অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকেই সব খরচ বাদ দিয়ে তার মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিট আয় হচ্ছে।
কৃষিতে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিও মিলেছে দ্রুত। বগুড়ার জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে কৃষকদের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় তাকে এবং সেখান থেকে তিনি ‘তরুণ উদ্যোক্তা’ হিসেবে সম্মানসূচক অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মো. মহিদুল হাসান মুন্না বলেন, “বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদের হার অনেক বেশি, যা নিয়ে কৃষি খামারে লাভবান হওয়া কঠিন। সরকারের পক্ষ থেকে যদি কৃষি ভর্তুকি অথবা তিন থেকে চার শতাংশের মতো স্বল্প সুদে কৃষি ঋণের সহায়তা পাই, তবে আমার খামার ও গরু মোটাতাজাকরণ প্রজেক্টটি আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে করে এলাকায় অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
তরুণ এই উদ্যোক্তার কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম।
মুন্নার উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, “কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বর্তমানে শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করছে। নেত্রকোনা সদর উপজেলার সিংহের বাংলা ইউনিয়নের ধীতপুর গ্রামের শিক্ষিত যুবক মুন্না কৃষিতে দারুণ আগ্রহ দেখিয়েছেন। আমি এখানে আসার পর থেকেই দেখছি তিনি টমেটো ও বিভিন্ন উচ্চফলনশীল সবজির পাশাপাশি ব্যানানা ম্যাঙ্গো, আপেল কুল, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও গবাদিপশুর খামার নিয়ে অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করছেন। একই সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত মানসম্মত ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেও তিনি বড় অবদান রাখছেন। অবশিষ্ট জমিতে ধান চাষ সব মিলিয়ে তিনি একজন স্বাবলম্বী কৃষক ও সফল উদ্যোক্তা। তিনি যদি আর্থিক সহায়তা পান, তবে ভবিষ্যতে আরও ভালো করবেন।”
ধীতপুর গ্রামের সবুজ প্রান্তরে মহিদুল হাসান মুন্না যে সম্ভাবনার বীজ বুনেছেন, তা কেবল তার একার সচ্ছলতার গল্প নয়; বরং শিক্ষিত তরুণদের হাত ধরে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির এক উজ্জ্বল ও আধুনিক রূপান্তরের প্রতিচ্ছবি।
পড়ুন : সবুজ সবজিতে ভরেছে মাঠ, উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক


