দেশে ওষুধের মোট চাহিদার ৯৫ শতাংশের বেশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হলেও চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে এখনো আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত অধিকাংশ চিকিৎসা সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তবে দেশেই এসব সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা গেলে ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ কর প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন খাতে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এ খাতকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ৩০তম মার্কিন বাণিজ্য মেলার (ইউএস ট্রেড শো ২০২৬) দ্বিতীয় দিনে স্বাস্থ্যসেবায় উদ্ভাবন ও বিনিয়োগবিষয়ক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) এবং ঢাকার মার্কিন দূতাবাস যৌথভাবে এ বাণিজ্য মেলার আয়োজন করেছে। গত ৫ নভেম্বর শুরু হওয়া এ আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্য, সেবা ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মেলার দ্বিতীয় দিনে অ্যামচ্যামের হেলথকেয়ার অ্যান্ড ফার্মা সাব-কমিটির উদ্যোগে ‘ইমপ্রুভিং পেশেন্ট আউটকামস অ্যাট স্কেল-আপ থ্রু পাবলিক অ্যান্ড প্রাইভেট কোলাবোরেশন’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, বাংলাদেশের ওষুধশিল্প ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৯৫ শতাংশের বেশি ওষুধ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসা সরঞ্জামের বাজার এখনো আমদানিনির্ভর। ফলে এই খাতে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নিজস্ব চাহিদার ৯৫ শতাংশের বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে। তবে প্রস্তুত বাজার থাকা সত্ত্বেও ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারের এই ব্যবসাটি এখনো আমদানিনির্ভর রয়ে গেছে। আমরা এই অবস্থার পরিবর্তন চাই। এ কারণেই আমরা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কর ছাড়ের সুবিধা দিচ্ছি, যা চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন খাতকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলেছে।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন বাজার তৈরি হবে। উৎপাদন সক্ষমতা ও মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে ভবিষ্যতে এসব পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
সেমিনারে আলোচকেরা দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, চিকিৎসা সহজলভ্য করা এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দেন।
অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন বেকটন ডিকিনসনের কান্ট্রি বিজনেস লিডার মির্জা সজীব রায়হান। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন মেডট্রনিক বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মায়াঙ্ক ত্রিপাঠি, স্কয়ার হাসপাতালের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট সুলতান মিনহাজ উদ্দিন, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. আক্তার হোসেন।
আলোচনায় দেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। বিশেষ করে আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জামের সহজলভ্যতা এবং হাসপাতালের সেবার মান বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে শুধু বিনিয়োগ বাড়ালেই হবে না, এ খাতে দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক উৎপাদন অবকাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি। এসব ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মেলার দ্বিতীয় দিনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে। ‘সিলেক্টইউএসএ: পাথওয়েজ ফর আউটবাউন্ড ইনভেস্টমেন্ট’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস।
সেমিনারে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সরাসরি বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরির বিভিন্ন পথ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর পল ফ্রস্ট। এতে অংশ নেন ট্রান্সকম গ্রুপের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান, ওমেরা পেট্রোলিয়ামের সিইও তানজিম চৌধুরী এবং পিডব্লিউসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ‘সিলেক্টইউএসএ’, মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ এবং দেশটির বিভিন্ন বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ ভার্চুয়ালি আলোচনায় যুক্ত হন।
সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ, ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিদ্যমান সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগ ও কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে পারেন, সে বিষয়েও বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে।
এদিকে তিন দিনব্যাপী মার্কিন বাণিজ্য মেলায় অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের সর্বাধুনিক পণ্য, সেবা ও প্রযুক্তি প্রদর্শন করছে। এসব প্রদর্শনী ঘিরে দর্শনার্থী, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ ও সম্ভাব্য অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
আয়োজকদের মতে, এ ধরনের বাণিজ্য মেলা দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির মতো সম্ভাবনাময় খাতে যৌথ উদ্যোগের সুযোগ রয়েছে।
গত ৫ নভেম্বর শুরু হওয়া ৩০তম ইউএস ট্রেড শো ২০২৬ আগামী ৭ নভেম্বর শেষ হবে। শেষ দিনে পারস্পরিক বাণিজ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে আরও দুটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এবারের বাণিজ্য মেলায় স্বাস্থ্য খাতে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারের চিকিৎসা সরঞ্জামের বাজারে দেশীয় শিল্পের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও উৎপাদন খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
পড়ুন:শীতের সবজির সরবরাহ বাড়ায় স্বস্তি ক্রেতাদের, চড়া মাছ-মাংসের বাজার
ইমি/


