মেজর লিগ সকারে (এমএলএস) আবারও ইতিহাস গড়লেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতায় প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা দ্বিতীয়বারের মতো লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার গোল্ডেন বুট জিতেছেন ইন্টার মায়ামির এই অধিনায়ক। ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকে দারুণ একটি মৌসুম কাটালেও শেষ ম্যাচে জয় পায়নি তার দল। শার্লট এফসির বিপক্ষে ৩-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ৩-৩ গোলে ড্র করতে হয়েছে মায়ামিকে।
এমএলএসের নিয়মিত মৌসুমের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশ সময় রোববার ভোর ৩টায় নিজেদের মাঠ ন্যু স্টেডিয়ামে শার্লট এফসির মুখোমুখি হয় ইন্টার মায়ামি। ম্যাচটিতে মেসি গোল করতে না পারলেও পুরো মৌসুমের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে গোল্ডেন বুট নিশ্চিত করেন। নিয়মিত মৌসুমে ২৬ গোল করে গোলদাতাদের তালিকার শীর্ষে থেকেই আসর শেষ করেছেন ৩৯ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন তারকা।
মেসির সবচেয়ে কাছাকাছি ছিলেন এফসি ডালাসের পেতার মুসা। ২২ গোল করে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন তিনি। ২১ গোল নিয়ে তৃতীয় হয়েছেন ন্যাশভিলের স্যাম সারিজ। অন্যদিকে ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপসের ব্রায়ান হোয়াইট ২০ গোল করে রয়েছেন চতুর্থ অবস্থানে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে টানা দ্বিতীয়বার গোল্ডেন বুট জয় মেসির ক্যারিয়ারে যোগ করেছে আরেকটি অনন্য অর্জন।
এর আগে গত মৌসুমেও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন মেসি। সেবার ২৯ গোল করে এমএলএসের এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। এবার গোলসংখ্যা কিছুটা কম হলেও গোল করার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন এই ফরোয়ার্ড। বিশেষ করে দলের আক্রমণভাগে তার প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো।
শুধু ব্যক্তিগত গোলসংখ্যাতেই নয়, দলীয় পারফরম্যান্সেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন মেসি। নিয়মিত মৌসুমে ৮০টি গোল করে এমএলএসে নিজেদের নতুন রেকর্ড গড়েছে ইন্টার মায়ামি। এর মধ্যে একাই ২৬টি গোল করেছেন মেসি। অর্থাৎ দলের মোট গোলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এসেছে তার পা থেকে। ফলে মায়ামির আক্রমণভাগে তার গুরুত্ব কতটা, তা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।
গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। নিয়মিত মৌসুমে তার অ্যাসিস্টের সংখ্যা ১৭। লিগে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট করা পেপ বিয়েলের চেয়ে মাত্র একটি কম এটি। সব মিলিয়ে ২ হাজার ৬৬৪ মিনিট মাঠে থেকেই গোল ও অ্যাসিস্টে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন মেসি।
গোলের সুযোগ তৈরি এবং প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে আক্রমণ চালানোর ক্ষেত্রেও অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন তিনি। নিয়মিত মৌসুমে মোট ১৮৩টি শট নিয়েছেন মেসি। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের মিলান ইলোস্কির শটসংখ্যা ১২২। অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থানে থাকা খেলোয়াড়ের চেয়ে ৬১টি বেশি শট নিয়েছেন মেসি।
লক্ষ্যে রাখা শটের পরিসংখ্যানেও সবার ওপরে রয়েছেন তিনি। পুরো মৌসুমে ৭৬টি শট লক্ষ্যে রেখেছেন মেসি। তার পরেই রয়েছেন লস অ্যাঞ্জেলেস এফসির ডেনিস বুয়াঙ্গা, যার লক্ষ্যে রাখা শটের সংখ্যা ৫১। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে কতটা ধারাবাহিক চাপ তৈরি করেছেন মায়ামির এই তারকা।
মৌসুমে মেসির অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল আগস্টে মন্ট্রিয়লের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে প্রতিপক্ষকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দেয় ইন্টার মায়ামি। আর দলের বড় জয়ে একাই চারটি গোল করেছিলেন মেসি। তার এমন বিধ্বংসী পারফরম্যান্সই আবারও মনে করিয়ে দেয়, বয়স বাড়লেও গোল করার ক্ষুধা কিংবা মাঠে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা কমেনি তার।
এবার অবশ্য মেসির সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ এমএলএস কাপ ধরে রাখা। ২০১১ ও ২০১২ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস গ্যালাক্সির পর কোনো দল টানা দুই মৌসুমে এই শিরোপা জিততে পারেনি। সেই ইতিহাস বদলানোর লক্ষ্য নিয়েই প্লে-অফে নামবে ইন্টার মায়ামি।
ইস্টার্ন কনফারেন্সে রেকর্ড গড়া ন্যাশভিলের পেছনে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে নিয়মিত মৌসুম শেষ করেছে মায়ামি। প্লে-অফের প্রথম রাউন্ডে তাদের প্রতিপক্ষ সপ্তম বাছাই কলম্বাস ক্রু। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে মেসির অভিজ্ঞতা ও গোল করার দক্ষতা দলটির জন্য বড় ভরসা হয়ে থাকবে।
ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও মেসির সামনে রয়েছে আরও একটি ইতিহাস গড়ার সুযোগ। টানা তৃতীয়বারের মতো এমএলএসের বর্ষসেরা খেলোয়াড় বা এমভিপি হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন তিনি। গত মৌসুমে দ্বিতীয়বারের মতো এই পুরস্কার জিতে ইতিহাস গড়েছিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
এর আগে কেবল প্রেকিই ১৯৯৭ ও ২০০৩ সালে দুবার এমভিপি হওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। এবার গোল্ডেন বুট জয় মেসির এমভিপি হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে। তবে এই পুরস্কারের ক্ষেত্রে শুধু গোল কিংবা অ্যাসিস্ট নয়, গণমাধ্যমকর্মী, খেলোয়াড় ও ক্লাব কর্মকর্তাদের ভোটও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
আরেকটি স্মরণীয় মৌসুম কাটিয়েছেন লিওনেল মেসি। গোল, অ্যাসিস্ট, শট ও ব্যক্তিগত রেকর্ড—প্রায় সব ক্ষেত্রেই নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। এখন দেখার বিষয়, গোল্ডেন বুট জয়ের পর এমভিপি পুরস্কারও নিজের করে নিতে পারেন কি না এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। একই সঙ্গে ইন্টার মায়ামিকে টানা দ্বিতীয়বার এমএলএস কাপ জেতাতে পারেন কি না, সেটিও ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকবে।
পড়ুন:ম্যানচেস্টারের দুই জায়ান্টেরই হার, বিপর্যয়ে সিটি-ইউনাইটেড
ইমি/


