31.2 C
Dhaka
০৪/০৩/২০২৬, ১২:৫৯ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের পরমাণু কার্যক্রম ধ্বংসের পরিকল্পনা করেছিলো ইসরায়েল-ভারত

বর্তমানে পৃথিবীতে পারমাণবিক শক্তিধর ৯ দেশের মধ্যে অন্যতম হলো পাকিস্তান। তবে সপ্তম দেশ হিসেবে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরো বিশ্বকেই অবাক করে দিয়েছিলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ভারতের নজর থেকে বাঁচিয়ে এখনও তাদের পরমাণু স্থাপনা রক্ষা করতে পেরেছে পাকিস্তান।

বিজ্ঞাপন

কখনও কখনও একটি জাতির অস্তিত্ব, মর্যাদা ও আত্মরক্ষার দায়িত্ব এসে পড়ে একজন মানুষের কাঁধে। তিনি থাকেন গবেষণাগারে, সামনে থাকে না ট্যাংক বা রাইফেল, কিন্তু তার কাজের ফলাফল পুরো জাতিকে রক্ষা করে দেয় যুদ্ধ ছাড়াই। পাকিস্তানের ইতিহাসে এমন এক ব্যক্তি ছিলেন ড. আবদুল কাদির খান। একজন বিজ্ঞানী, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শুধু বন্দুকের নয়, মর্যাদারও। যেখানে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র ছিল খ্রিস্টান, ইহুদি ও হিন্দু শক্তির দখলে, সেখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘ইসলামিক বোমা কেন নয়?’

১৯৭৪ সালের মে মাসে ষষ্ঠ দেশ হিসেবে প্রতিবেশী ভারত পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর পর থেকেই পাকিস্তানের ভিতরে জন্ম নেয় ভয়, উদ্বেগ, আর এক অসম প্রতিযোগিতার চাপ। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বললেন—“আমরা না খেয়ে থাকব, তবুও বোমা বানাব।” আর সেই কঠিন স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এক প্রবাসী বিজ্ঞানী ড. কাদির খান।

তিনি জানতেন, পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার হত্যার তালিকায় উঠবে তার নাম, হত্যার ছক আঁকবে মোসাদ, কিন্তু তবুও থেমে যাননি তিনি। তার নেতৃত্বে ১৯৭০-৮০-এর দশকে ইসলামাবাদে পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য একটি সাহসী অভিযান শুরু হয়। বহু হুমকি আর প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত সফলভাবে পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলে পাকিস্তান।

পাকিস্তানের পারমাণবিক সফলতা ভালোভাবে নেয়নি ভারত ও পশ্চিমা দেশগুলো। পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমা তৈরির কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য ছিল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের কাছে। ইসরায়েল ও ভারত একসঙ্গে পরিকল্পনা করে পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনাতে হামলার। কাদির খান জানতেন তার সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এক রাতেই। তবুও থেমে যাননি তিনি। সাহসিকতার সাথে আরও দ্রুত কাজ করতে থাকেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর সাবেক পরিচালক জর্জ টেনেট আবদুল কাদির খানকে “ওসামা বিন লাদেনের মতো বিপজ্জনক” বলে মন্তব্য করেছিলেন এবং প্রাক্তন মোসাদ প্রধান শাবতাই শাবিত তাকে হত্যা না করার জন্য অনুতপ্ত ছিলেন।

পাকিস্তানের পারমাণবিক সফলতা চোখের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় ইসরায়েলের জন্য। অভিযোগ রয়েছে, পাকিস্তানকে পারমাণবিক শক্তি অর্জন থেকে বিরত রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যার চেষ্টা করেছিলো ইসরায়েল। ১৯৮০-এর দশকে ইসরায়েল ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার পরিকল্পনাও করেছিলো, যে পরিকল্পনা থেকে ভারত সরকার পরে সরে আসে। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের জুন মাসে ৮ ডেজ ম্যাগাজিন এ এই অভিযানের কথা উঠে আসে।

পাকিস্তানকে পারমাণবিক বোমা তৈরী থেকে আটকে রাখতে মোসাদসহ বিভিন্ন দেশের সংগঠনগুলো খানকে হত্যার কয়েবার প্রচেষ্টা করে। একটি কোম্পানির মালিক সিগফ্রাইড শেরটলার সুইস ফেডারেল পুলিশকে জানান, মোসাদের এজেন্টরা তাকে এবং তার বিক্রয়কর্মীদের বারবার ফোন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জার্মানিতে ইসরায়েলি দূতাবাসের ডেভিড নামে একজন কর্মচারী তার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, যিনি তাকে পারমাণবিক অস্ত্র সম্পর্কিত “এই ব্যবসা” বন্ধ করতে বলেছিলেন।

পাকিস্তানকে পারমাণবিক অস্ত্রে সফলতা থেকে পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে ইসরায়েল যেন উঠে পড়ে লেগেছিলো। এর কারন হলো, কোনো মুসলিম দেশ পারমাণবিক অস্ত্রে সফল হোক এটি তারা চায়নি। পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির প্রাক্তন কর্মকর্তা ফিরোজ খানের মতে, ‘ইসরায়েলিরা চায়নি যে কোনো মুসলিম দেশ তাদের বহরে বোমা রাখুক।’ 

১৯৮০’র দশকে ইসরায়েল ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে পাকিস্তানের কাহুতা পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অনুমোদনও দেন। ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান গুজরাটের জামনগর ঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের পরিকল্পনা নেয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গান্ধী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলে এই হামলা বন্ধ হয়।

এরপর ১৯৮৭ সালে সেনাপ্রধান সুন্দরজী পাকিস্তান সীমান্তে বিশাল সেনা ও ট্যাংক পাঠিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেন, যেন কাহুতায় হামলা চালানো যায়। তবে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী বিষয়টি জানতে পেরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

যখন ভারত ও ইসরায়েল পাকিস্তানের ওপর চড়াও হওয়ার প্রস্তুতি নেয়, তখন বেইজিং ও ওয়াশিংটন থেকে আসে ভিন্ন বার্তা। চীন সরাসরি ইউরেনিয়াম, ট্রিটিয়াম এবং বিজ্ঞানী সরবরাহ করে পাকিস্তানের পাশে এসে দাাঁড়ায়। আর যুক্তরাষ্ট্রের যেহেতু আফগান যুদ্ধে পাকিস্তানের সহায়তা প্রয়োজন ছিলো, তাই তারা সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি।

প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার পাকিস্তানের সহায়তা বন্ধ করলেও, সোভিয়েত আগ্রাসনের পর ফের তা চালু করেন। যুক্তরাষ্ট্র গোপনে পাকিস্তানের বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণও দেয়।

১৯৮০-এর দশকে, যুক্তরাষ্ট্র গোপনে পাকিস্তানি পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেয় এবং তার কর্মসূচি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। কিন্তু শীতল যুদ্ধের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বদলে যায়।

১৯৯০ সালে শীতল যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটতেই যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন সুর শোনা যায়। অক্টোবরেই তারা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়। তখন পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে বলে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বন্ধ করবে। কিন্তু পরে এ কাদির খান স্বীকার করেন, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম গোপনে চলেছে। 

১৯৯৮ সালের ১১ মে ভারত পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। তার ঠিক ১৭ দিন পর, ২৮ মে পাকিস্তানও সফলভাবে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায়। পাকিস্তান তখন বিশ্বের সপ্তম পারমাণবিক শক্তি। আর দক্ষিণ এশিয়ায় ভারসাম্য ফিরে আসে। এর মাধ্যমে কাদির খান হয়ে ওঠেন জাতীয় নায়ক। টেলিভিশনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন, “কে বানিয়েছে বোমা? আমি। কে বানিয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র? আমিই বানিয়েছি।”

১৯৮০’র দশকের মাঝামাঝি থেকেই ড. খান গড়ে তুলেছিলেন গোপন এক পারমাণবিক নেটওয়ার্ক। তিনি যন্ত্রাংশ দ্বিগুণ পরিমাণে অর্ডার করতেন। অতিরিক্ত অংশগুলো বিক্রি করতেন ইরান, লিবিয়া ও উত্তর কোরিয়ায়। এই দেশগুলোকে পারমাণবিক সফলতা অর্জনে সহায়তাও করেছেন তিনি। এর মধ্যে পরবর্তীতে উত্তর কোরিয়া পরবর্তীতে পারমাণবিক সফলতা অর্জন করেন।

পরবর্তীতে ২০০৪ সালে টেলিভিশনে আবেগঘন এক বক্তব্যে ড. কাদির খান স্বীকার করেন তার নেটওয়ার্কের কথা। তিনি জানান, তিনি একাই কাজ করেছেন, দেশের কেউ জড়িত নয়। প্রেসিডেন্ট মোশাররফ তাকে “আমার নায়ক” আখ্যা দিয়ে ক্ষমা করেন। তবে মার্কিন চাপের মুখে তাকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত গৃহবন্দী রাখা হয়।

পরবর্তীতে তিনি বলেছিলেন, “আমি একবার দেশকে বাঁচিয়েছিলাম বোমা বানিয়ে, আরেকবার বাঁচিয়েছিলাম সব দোষ নিজের কাঁধে নিয়ে।”

এনএ/

দেখুন: ধেয়ে আসছে অশনি সংকেত! পরমাণু অ/স্ত্রে/র লাগাম টানবে কে?

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন