নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রোগীদের খাবারে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি খাদ্যতালিকায় রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার সরবরাহের কথা থাকলেও, বাস্তবে তার বড় অংশই রোগীদের পাতে জুটছে না বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য (১-২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) অনুযায়ী, রোগীদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় উন্নতমানের চাল, ডিম, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি, দুধ এবং ফলের মতো পুষ্টিকর উপাদান থাকার কথা। সরকারিভাবে ভর্তিকৃত রোগী দৈনিক ১৭৫ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। বিশেষ দিনগুলোতে পোলাও ও খাসির মাংস দেওয়ার কথাও দরপত্রের শর্তে উল্লেখ আছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন- সকালের নাশতা দেওয়া হচ্ছে মাত্র এক পিস পাউরুটি, একটি ছোট সাইজের সিদ্ধ ডিম, সামান্য চিনি ও একটি ছোট আকারের চিনিচাম্পা কলা। দুপুরের খাবারে মাছ দেওয়ার নির্ধারিত দিনে দেওয়া হচ্ছে মুরগির মাংস, সেটিও ওজনে অনেক কম। সবজি প্রায়ই দেওয়া হয় না এবং ডাল এতটাই পাতলা যে তা নিয়ে রোগীদের মাঝে চরম ক্ষোভ রয়েছে।
চিকিৎসাধীন রোগীরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, খাবারের মান ও পরিমাণ কোনোভাবেই ঠিক রাখা হচ্ছে না। অনেক সময় রাতে ১০-১৫ জন রোগী খাবারই পান না।
“ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছি, কিন্তু খাবার ঠিকমতো পাই না। মাছ ছোট, মাংস কম, সবজি প্রায়ই দেওয়া হয় না। ডাল এতটাই পাতলা যে তা দুরবীন দিয়ে দেখতে হয়!”- মো. হয়রত আলী, আজিজুল, মিম ও ফিরোজা বেগম (চিকিৎসাধীন রোগী)
“আজকে রুই মাছ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ঠিকাদার সিলভার কার্প মাছ দিয়েছে। ডাল পাতলা হওয়ার কারণ- যা দেওয়া হয়, তাই রান্না করি। ঠিকাদার সবকিছুই কম দেন।”- মজনু ফকির (বাবুর্চি)।
হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স (ইনচার্জ) মিল্টন রাকসাম জানান, খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. সোহরাব হোসাইন লিংকন বলেন, “ঠিকাদার মের্সাস চৌধুরী সিন্ডিকেটকে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে, অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মের্সাস চৌধুরী সিন্ডিকেটের স্বত্বাধিকারী আলী হায়দার চৌধুরী নিজের দায় এড়িয়ে বলেন, “আমি বর্তমানে সরাসরি ঠিকাদারি করি না। আমার লাইসেন্স শোয়েব নামে একজন ব্যবহার করছেন। অনিয়মের বিষয়ে আমার জানা নেই।”
পুরো বিষয়টি নিয়ে নেত্রকোনার সিভিল সার্জন ডা. মো. গোলাম মাওলা বলেন, “এর আগে কেউ আমাকে বিষয়টি জানায়নি। আপনার মাধ্যমে এখন জানতে পেরেছি। দ্রুত খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কলমাকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ শামীম বলেন, “স্বাস্থ্যসেবায় খাদ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। চিকিৎসাধীন রোগীদের জন্য পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করা শুধু দায়িত্ব নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকারও।”
সচেতন মহল অবিলম্বে অনিয়ম বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।


