ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টানা এক যুগের বেশি সময় শাসনের অবসান ঘটিয়ে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ২০৬টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। অন্যদিকে, মাত্র ৭৮টি আসনে জয় পেয়ে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস।
সবচেয়ে বড় চমক এসেছে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের আসনে। বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছেন তিনি। নন্দীগ্রামের পর এবার ঘরের মাঠেও পরাজয় বরণ করতে হলো তাকে।
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিজেপি এককভাবে ১৯৫টি আসন জিতে সরকার গঠনের পথ পরিষ্কার করেছে। বিপরীতে তৃণমূলের আসন সংখ্যা গতবারের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৮-তে।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছে। যদিও তৃণমূল বরাবরই ধর্মীয় বহুত্ববাদ এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার ওপর জোর দেয়। তবে গত ১৫ বছর ধরে ৯ কোটিরও বেশি মানুষের এই রাজ্য মমতা ও তার দল শাসন করলেও সেখানে ধীরে ধীরে নিজেদের জায়গা পোক্ত করেছে বিজেপি। যেখানে একসময় প্রান্তিক শক্তি ছিল মোদির এই রাজনৈতিক দল।
সোমবার সেই দৃশ্যপট বদলে গেল। পশ্চিমবঙ্গ জয় করল মোদির বিজেপি। গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফল আজ ঘোষণা করা হচ্ছে। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, মোদির সুশৃঙ্খল নির্বাচনী কলাকৌশল বিজেপিকে এক অভাবনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিতে চলেছে। এমন একটি রাজ্যে বিজেপি এই বিজয় পেল, যেখানকার মানুষ ছিলেন দলের আদর্শিক প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু এর আগে বিজেপি কখনও সেখানে জিততে পারেনি।
সোমবার যে পাঁচটি রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ তার মধ্যে অন্যতম। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যে অভিনেতা সি জোসেফ বিজয়ের নতুন দল টিভিকি সেখানকার প্রভাবশালী দলগুলোকে হারিয়ে চমক দেখিয়েছে। প্রতিবেশী কেরালায় প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস বামপন্থীদের জোটকে পরাজিত করেছে। পুদুচেরিতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হয়েছে। আর উত্তর-পূর্বের রাজ্য আসামে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরেছে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, সোমবারের ফলাফলগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ফলই রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। বিজেপি ধর্মীয় মেরুকরণ এবং দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়াকে কাজে লাগিয়ে এই জয় ছিনিয়ে নিয়েছে।
কংগ্রেসের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৭৭ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা বামফ্রন্ট জোটের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই না করার অভিযোগে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই আইনজীবী ও শিক্ষার্থীনেত্রী শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে কমিউনিস্টদের পরাজিত করে রাজ্য জয় করেন।
২০১৪ সালে মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই মমতা বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি তার রাজনীতিকে; বিশেষ করে মুসলিমদের সুরক্ষা প্রদানকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি নারীদের জন্য একগুচ্ছ জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করেন এবং বড় শিল্পের জন্য বিতর্কিত জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। চেন্নাইয়ের শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং নির্বাচনী পর্যবেক্ষক রাহুল ভার্মা বলেন, ‘‘মমতার প্রতি দৃশ্যমান জনসমর্থন ছিল এবং তিনি জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামোর বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ কাজ করছিল। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিনের জীবনে তাদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ নিয়ে মানুষ খুশি ছিল না।’’
তিনি বলেন, বিজেপি এবার অনেক বেশি পরিকল্পিত প্রচারণা চালিয়েছে। এটি বিজেপির জন্য কঠিন নির্বাচন ছিল। কিন্তু অসম্ভব ছিল না। অধ্যাপক ভার্মা বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জন্য একটি পথ খোলাই ছিল এবং সব পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় এই ফল এসেছে। শক্তিশালী সরকার-বিরোধী হাওয়া ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে এমন ফলাফল সম্ভব হতো না।’’
এবারের নির্বাচনে প্রায় ৬ কোটি ৮২ লাখ মানুষ ভোট দিয়েছেন। যা মোট ভোটের প্রায় ৯২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। রাজ্যের ইতিহাসে ভোটদানের একটি রেকর্ডও এটি।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

