চলতি বছরের মার্চ মাসে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয় এবং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১ মে পর্যন্ত ২৬ হাজারের বেশি হামের উপসর্গের রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ২৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৪৯।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১ মে পর্যন্ত সারা দেশে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৪৬ জন। আর ১৫ মার্চ থেকে ১ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৩৮ হাজার ৩০১।
প্রতিদিন হাজারেরও বেশি নতুন রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ও মৃত্যু ঢাকা বিভাগে। ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ রাজশাহী বিভাগে। বিভাগটিতে হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ৭০। এর মধ্যে শুধু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই মৃত্যুর ঘটনা ৫৩।
মৃত্যু বাড়ার আশঙ্কা কেন?
বিট্রিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, হামে প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা সেবার ঘাটতি থাকায় রোগীরা বড় শহরে আসছেন। এর চাপ পড়ছে ঢাকাতেও। হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে হাম আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে। যদিও এর মধ্যেই সারা দেশে হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। টার্গেটের প্রায় ৬১ শতাংশ টিকা দেওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু এরপরও হামের সংক্রমণ কমছে না, মৃত্যুও থামছে না।
এর পেছনে অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, ‘যদি ভালোমতো রোগীদের ম্যানেজ করা যেত, ঠিকমতো আইসোলেশন করা যেত, তাহলে দুটো কাজ হতো। একটা হলো আমরা রোগীর সংখ্যা কমাতে পারতাম। আরেকটা হলো মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে পারতাম।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মনে করছে, রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন স্থিতিশীল। কারণ টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে এরকম স্থিতিশীল থাকলেই যে সংক্রমণ কমতে শুরু করবে সেরকমটা মনে করছেন না ডা. বে-নজীর আহমেদ।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘টিকা দিয়ে প্রতিরোধে তো সময় লাগে। টিকা পেলে শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে সময় লাগে। এখানে পনের দিন বা এক মাস এরকমটা সময় লাগবে।’
সবগুলো বিভাগে হাম ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে স্বাস্থ্যসেবায় নানা দুর্বলতা স্পষ্ট হচ্ছে। যার ফলে টিকা কার্যক্রম চললেও সামনের দিনগুলোতে, বিশেষ করে, মৃত্যু বাড়বে বলে সতর্ক করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘সামনের দিনগুলোতে হামের সংক্রমণ কমলেও মৃত্যু বেড়ে যেতে পারে। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা আশা করি হামের সংক্রমণ কমে যাবে। কিন্তু মৃত্যু কমতে আমাদের আরও এক মাস সময় বেশি লাগবে। কারণ ইতোমধ্যেই যারা সংক্রমিত হয়ে যাবে, যাদের মধ্যে পুষ্টি কম বা আগে থেকে অন্যান্য রোগে ভুগছে, তারা গুরুতর পর্যায়ে চলে যাবে। ফলে এখন হয়তো মৃত্যু আমরা বাড়তির দিকে দেখব।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মহামারি বা জরুরি অবস্থা ঘোষণা হলে সরকারের সব বিভাগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে যাবে, কাজে গতি আসবে, এমনকি দ্রুত টিকা পেতেও ভূমিকা রাখবে।
তবে সরকার সেরকম কোনো ঘোষণার ইঙ্গিত দেয়নি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে যেরকম সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দরকার সেটা হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগ হিমশিম খাচ্ছে রোগীর চাহিদা সামাল দিতে। বিশেষ করে আইসিইউ সংকটের কথা সামনে আসছে।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য বলছে, তারা নজর বেশি দিচ্ছেন সংক্রমণ কমানোর ওপর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘রোগীর সংখ্যা যদি বেড়ে যায় তাহলে তো একটা ক্রাইসিস হবে। এখানে কোনো সন্দেহ নেই। এটাকে হাইড করারও কিছু নেই। কিন্তু ব্যাপারটা আবার এমন না যে খারাপ অবস্থা নিয়ে যত রোগী আসবে সবাইকে আমি একটা করে আইসিইউ বেড দিয়ে দিতে পারব। এজন্য আমাদের ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য যেটা থাকে সেটা হচ্ছে, হামের রোগীর সংখ্যা কমানো।’
সংক্রমণ কমাতে সরকার ইতোমধ্যেই সারা দেশে বিশেষ টিকা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ পর্যন্ত এক কোটি দশ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এটা মোট টার্গেটের ৬১ শতাংশ। সামনের দিনগুলোতে বাকি টার্গেট পূরণ হবে।
ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘এটা হলে আশা করি আগামী ৮ থেকে ১৫ মের মধ্যে সংক্রমণ কমা শুরু করবে। তখন হাসপাতাল, আইসিইউর ওপর চাপ কমে যাবে।’
সূত্র: বিবিসি বাংলা
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

