কুড়িগ্রামের চিলমারীর একটি ছোট্ট গ্রাম—মাচাবান্দা শাহপাড়া। সাধারণ দিনের মতোই ১৭ এপ্রিল সকালটা শুরু হয়েছিল। উঠোনে খেলছিল দুই বছরের শিশু আয়শা। কারও কল্পনাতেও ছিল না, এ দিনই তার জীবনের শেষ দিন হয়ে উঠবে।
খেলতে খেলতেই হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায় আয়শা। প্রথমে বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবেই নেয় পরিবার—হয়তো পাশের বাড়িতে গেছে, একটু পরই ফিরে আসবে। কিন্তু সময় গড়াতে থাকে, উদ্বেগ বাড়ে। দুপুর পেরিয়ে বিকেল, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা—গ্রামের প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি কোণা খুঁজেও মেলে না তার খোঁজ।
রাত নেমে এলে শুরু হয় এক আতঙ্কের অধ্যায়। অবশেষে, বাড়ির পাশেই মিললো ছোট্ট আয়শার নিথর দেহ। সেই মুহূর্তেই পুরো গ্রাম স্তব্ধ হয়ে যায়। কান্না, ক্ষোভ আর আতঙ্কে ফেটে পড়ে এলাকা।
ঘটনাটি দ্রুতই চাঞ্চল্যে রূপ নেয়। হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে এলাকাবাসী থানা ঘেরাও করে, মানববন্ধন গড়ে ওঠে। কিন্তু রহস্য তখনও অন্ধকারেই—কোনো সূত্র নেই, কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। এটি পরিণত হয় একটি ‘ক্লুলেস’ মামলায়।
দিন যায়, উত্তেজনা বাড়ে, প্রশ্নও বাড়তে থাকে—কে নিলো এই নিষ্পাপ প্রাণ?
অবশেষে ১৩ দিনের মাথায় বেরিয়ে আসে সেই ভয়ংকর সত্য।
পুলিশের নিবিড় তদন্তে গ্রেফতার হয় আয়শারই প্রতিবেশী রিকশাচালক রাশেদুল ইসলাম আপেল ও তার স্ত্রী কোহিনুর বেগম। যাদের ঘরের পাশেই খেলত আয়শা, যাদেরকে বিশ্বাস করত পরিবার—সেই পরিচিত মানুষদের দিকেই আঙুল উঠে আসে।
আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে শিশু আয়শা হত্যা ঘটনার মর্মান্তিক বর্ণনা।
সেদিন খেলতে গিয়ে একটি ছোট্ট ভুল—একটি কলমের আঘাত। আয়শার চোখে লাগে, রক্ত বের হয়। ব্যথায় কাঁদতে থাকে সে। সেই কান্নাই যেন হয়ে ওঠে তার মৃত্যুর কারণ।
আতঙ্কে কোহিনুর শিশুটির মুখ চেপে ধরে—চুপ করানোর চেষ্টা। কিন্তু সেই চেষ্টাই হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আয়শা।
এরপর যা ঘটে, তা আরও শিউরে ওঠার মতো। ভয়ে আয়শাকে একটি ড্রামের ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে বন্দী থাকে শিশুটি—অবশেষে নিভে যায় তার জীবন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সন্ধ্যার অন্ধকারে স্বামী-স্ত্রী মিলে মরদেহ ফেলে রাখা হয় বাড়ির পাশেই—যেন কিছুই হয়নি।
এই নির্মম সত্য প্রকাশের পর স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো এলাকা। মানুষের মুখে একটাই প্রশ্ন—একটি ছোট্ট দুর্ঘটনা কেন এমন ভয়াবহ পরিণতি নিলো?
চিলমারীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম বলেন, এটি একটি ক্লুলেস মামলা ছিল। পুলিশ সুপারের দিক নির্দেশনায় পুলিশ নিবিড় তদন্ত করে হত্যারহস্য উদঘাটনসহ জড়িতদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।’
চিলমারী মডেল থানার নবনিযুক্ত ওসি নয়ন কুমার বলেন, গ্রেফতার আসামিদের শুক্রবার বিকালে আদালতে সোপর্দ করা হয়। এর মধ্যে কোহিনুর বেগম হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আদালত জবানবন্দি নথিভুক্ত করে উভয় আসামিকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
পড়ুন : ভুরুঙ্গামারীতে জামাইকে পিটিয়ে হত্যা, র্যাবের অভিযানে আটক ২


