লেখকঃ ফয়সাল মোরশেদ
সেদিন আকাশে মেঘ ছিলো। শীতের এমন প্রকোপ না। এই রোদ আর এই বৃষ্টি। চারপাশে মানুষ আর মানুষ।
হাতিয়া দ্বীপ সরকারী কলেজ মাঠ। ক্ষণে ক্ষণে হেলিকপ্টারের পাখার ঘূর্ণি শব্দ। মাথা তুলে তাকাতেই সূর্যের তেজ চোখে পড়লো মেঘের ফাঁক গলে।
ইষাণ কোনে তখনও মেঘ। বৃষ্টি বোধহয় আবারও ভেজাবে। আমি বসে আছি মঞ্চ থেকে একটু দূরে। কতই বা হবে বয়স তখন। এই ক্লাস সেভেন বা এইটে পড়ি বেধয়।
হাফপ্যান্ট শেষে ফুল প্যান্ট পরা শিখছি তখন। আমি আর তন্ময়। আমরা দুই ভাই বসে মঞ্চের কাছাকাছি।
বক্তৃতার মঞ্চে তখন একের পর এক বড় বড় নেতা। আমার চোখ মঞ্চে না। চারপাশে।
দ্বীপ কলেজের বিশাল বড় মাঠ তখন কানায় কানায় পূর্ণ। যেদিকে দু’চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। চুপিচুপি বসে আমরা দুই ভাই। আমি আর তন্ময়। তন্ময় তখন আরও ছোট। প্রাইমারী র শেষ ক্লাসে বোধহয়।
সময় যাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা যখন সূর্যের মতো বিকেলের ঘরে হেলে পড়লো, তখন এলেন তিনি। হেলিকপ্টারের পাখা আওয়াজ তুললো মাথার উপরে। এই প্রথম এতো কাছে হেলিকপ্টার।
দৃষ্টিসীমার এতো কাছে আগে দেখিনি মহাপতঙ্গ। বইয়ে পড়েছিলাম। মাথার চুল উড়িয়ে পাশেই খালি রাখা অংশে নামলো বিশাল আকাশ যান।
পাখার ঘূর্ণি মনে কাঁপন তুলেছে কিনা জানিনা, তবে পরনে থাকা শার্ট উড়েছিলো। বাতাসের দমকে চোখ খুলে রাখা দায়। বাম হাতে কপালের চুল সরিয়ে, চোখের পাতা পিট পিট করে তাকালাম সামনে।
চারপাশে নেতাকর্মী বেষ্টিত হয়ে নামলেন তিনি। ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন মঞ্চের দিকে। জনতার ফাঁক গলে তার হাসি হাসি মুখ চোখে পড়ছিলো।
চারপাশে জনতার হর্ষধ্বনি কানে বাজছিলো আমার। নানান স্লোগান এসে বিঁধছিলো ছোট ছোট কানে । পাশেই রাখা বড় বড় কাঠে ঘেরা মাইক সেট।
হর্ষধ্বনি যেন যন্ত্রণা হয়ে বিঁধছিলো কানে। আমি দু‘হাতে কান ঢাকলাম। চারপাশে উত্তেজিত জনতা। বিটিভির ক্যামেরা এসে ছবি তুলছে।
লজ্জা লজ্জা মুখে তাকিয়ে রইলাম ক্যামেরার দিকে। যদি টিভিতে দেখা যায়। পেছন থেকে উদ্বেলিত জনতার হর্ষধ্বনি আর চাপাচাপিতে কোনভাবে নিজেকে সামলাচ্ছি।
আমার চোখ গেলো তন্ময় এর দিকে। আমার অনেক ছোট ও। এখনো হাফপ্যান্ট পরা। ও তাকালো আমার দিকে। অসহায় চোখ। বেচারা ভয় পেয়েছে।
ভাইয়া, ডর লাগে। এ্যাতো ঠ্যালাঠেলি। চলেন যাই গই। আব্বু হিডবো। জেডা সাবও বইকবো। চলেন ভাইয়া।
আরেহ, কিচ্চু অইতনো ভাই। চুপচাপ শক্ত করি খাই থাক। আর বেশিক্কন লাইগদো না। খাবা ভাই। আব্বা আর কাকা ও তো আইসে। তই আণ্ডা আইলে হিডবো কিল্লাই।
ভাইয়া, এইটা ক্যামেরা নি? আংগোরে কি টিবিত দেবাইবো? কতক্কণে দেবাইবো? কারেণ ও ত থা না।
আরে আইজ্জা কারেণ থাইকবো। দ্যাশের পদানমন্তী আইসে না? আইজ্জা কদিন দ্যাচ্চা হিয়ারলাই কারেন যা না। অন চুপ করি বই থাক। ক্যামেরার মি চাই্চ্ছা ডাইরেক। তাইলে ব্যাডা বুজি যাইবো। তুই আঁরমি হিরি কতা ক। আঁই তোর মি হিরা কতা কই। বুইজ্জত্তি?
আইচ্চা ভাইয়া।
আমরা দুই ভাই কথা বলছি চিৎকার করে করে। মাইকের গমগমে আওয়াজে কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। মঞ্চের সামনে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থী।
তারা বসেছে সারিবদ্ধভাবে। সবার হাতে প্লাকার্ড। কারও হাতে ব্যানার। কারও হাতে বা ফেস্টুন।
আমার দৃষ্টি সব ছাপিয়ে মঞ্চে। সেখানে তখন উত্তেজনা। মঞ্চের সিঁড়ি ভেঙে তিনি উঠলেন উপরে। তার সহকর্মীরা ঝুঁকে সালাম করছেন। তিনি হাসিমুখে সম্ভাষণ জানাচ্ছেন।
সূর্য তখন পশ্চিমের দিকে হেলে পড়ছে। তিনি বসলেন মঞ্চে। পেছনে জোরে ঘুরছে ফ্যান। তার শাড়ীর আঁচলে দোল দিচ্ছে মেঘনা পেরুনো বাতাস। তিনি আঁচল সামলে নিলেন।
সামনে কাঁচোর টেবিলে রাখা পানির বোতল থেকে গ্লাসে ঢেলে দিলেন কেউ। তিনি গলা ভিজিয়ে নিলেন ।
হঠাৎই বাতাস বইতে শুরু করলো। মেঘেরও যেন আজ এখানে উপস্থিতি জরুরি। তারও যেন দাবী আছে। বাদলও তাই হাজির দ্বীপ সরকারী কলেজ মাঠে। বিশাল বড় মাঠ তখন কানায় কানায় পূর্ণ।
বাদল তখন নেমেছে। হালকা বাতাসে শরীরে কাঁপন ধরাচ্ছে যেন। পাশে রাখা অংক বই জামার ভেতরে ঢুকিয়ে নিলাম। যাতে ভিজে না যায়।
তন্ময়ের তখন কাঁদো কাঁদো চোখ। আব্বা যেমন রাগী। বড্ডা কাকা তেমনই কঠিন। দু’জনই হাই স্কুলের শিক্ষক। তার আসা উপলক্ষে তাদেরও আসতে হলো। ভয়ে আছি আমরা দু’জন। পাছে দেখে ফেললে বকা শুনতে হবে। অথবা মার খেতে হবে।
সময় বইছে। আমি তাকিয়ে মঞ্চে। সেখানে তখন উত্তজনা। হাতিয়ার তাবড় বড় বড় মানুষজন এসে উপস্থিত। কেউ কেউ এসে তার চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে সালাম দিচ্ছেন। কুশল বিনিময় করছেন। হাসিমুখে সবার প্রতিউত্তর করছেন তিনি। আমি তাকিয়ে সামনে। অবাক নয়নে। মানুষ এতো সুন্দর হয়?
আমাদের ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন। তিনি তার ব্যাপারে বলতেন, এককালে ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন তিনি। তারও কিছুদিন বা ক’বছর আগে, বিটিভিতে লাক্স সাবানের একটা বিজ্ঞাপন প্রচার হতো।
“লাক্সের ছোঁয়ায় আমি স্টার হয়ে যাই”। একটা ক্যাম্পেইন ছিলো, লাক্স কিনে বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বরিয়ার সাথে দেখা পাবার সুযোগ। আমাদের ন্যাশনাল টিভির সাদাকালো পর্দায় যখন হাজির হতেন ঐশ্বরিয়া, আমি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকতাম। মানুষ এতো সুন্দর হয়?
ইংরেজির স্যার বলতেন, তিনিও নাকি দেখতে সুন্দরূী ছিলেন। ঐশ্বরিয়ার চাইতেও।
আমি তখন তাকিয়ে মঞ্চে। পানি পান শেষে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে বাম হাতে টিস্যু রাখলেন তিনি। মাইকে তখন তার নাম ঘোষণা চলছে। তিনি নড়ে চড়ে বসলেন আবার।
বৃষ্টির দমক বাড়ছে। সাথে মাতাল হাওয়া। নাম ঘোষণা শেষে তিনি উঠলেন। ধীর কিন্তু দৃপ্ত পায়ে সামনে এগুলেন। তাকে জায়গা করে দিলেন নেতারা।
তিনি দাঁড়ালেন ডায়াসে। মুখের কাছে মাইক। সামনে হাজার হাজার জনতা। বৃষ্টির ফোঁটা বাড়ছে। বাড়ছে জোরও। হয়তো, মেঘনা পাড়ের আর্তি নিয়ে হাজির মেঘনার আকাশও।
আমি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে সামনে । কিশোর শরীর আমার। ছোট চোখে আমি কতোদূরই বা দেখি। মানুষের মাথা গলে তাকিয়ে সামনে। বৃষ্টির ফোঁটা এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে চোখের পাতা।
তন্ময়কে আরও কাছে টেনে নিলাম। মানুষের উত্তেজনা পারদ গতিতে বাড়ছে। মাইকে শব্দ হলো। যান্ত্রিক সেই মাথা ধরা শব্দটা। কানে তালা লেগে যাওয়ার মতো।
আমি দু’হাত কানে চাপালাম। তন্ময়ের চোখ কুঁচকে গেলো। আমাকে দেখে দু’হাতে কান ঢাকলো সে। মাইকের কান বিদীর্ণ করা ক্যিংংংংংং ক্যিংংংংং আওয়াজ ছাপিয়ে কানে এসে পৌঁছুলো তার আওয়াজ।
আসসালাম মু আলাইকুম।
ওয়ালাইকুম সালাম শুনতে পেলাম জনতার মাঝে। আমিও মনে মনে নিলাম। তন্ময় বোধয় আওয়াজ করেই উত্তর নিলো।
ওয়ালাইকুম সালাম।
আমি তাকিয়ে তখন ডায়াসে। এতকাল যাকে টিভিতে দেখেছি। রাত আটটার বাংলা সংবাদ কিংবা দুপুর তিনটার সংবাদ। সবার শুরুতে থাকতেন তিনি। আজ তিনি আমার সামনে। এই একটু দূরে।
তিনি বলে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে। হাতিয়ার নানান সমস্যা। সেগুলো সমাধানে তার সরকারের নেয়া নানান পদক্ষেপ আর আশ্বাসের কথা।
ছোট শরীর আমার। দেশ নিয়ে, সমাজ নিয়ে কতোটুকুই বা বুঝি। আমি বরং তাকিয়ে তার দিকে। বেশ কটা মাইকের কালো তার গলে কতোটুকুই বা আর দেখা যায় তাকে। তাও শৈশবের অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আমি।
তিনি ডান থেকে বামে হেলছেন। শিফন শাড়ীর ফাঁক গলে যতটুকু তাকে দেখা যায়। আমি দেখছি। আর বিমোহিত হচ্ছি। তন্ময়ও তাকিয়ে সামনের ডায়াসে। তন্ময় হয়ে।
কী ভাই, দেইখসোত্তি, খালদা জিয়া কী সোন্দর। শাই গান দ্যাখ। এমুন শাই দেইখসোত্তি জীবনে?
ঠিক কইসেন ভাইয়া। আর কতক্ষণ কতা কইবো পদানমন্তি? আব্বু চিল্লাইবো ভাইয়া। চলেন, এইবার যাই। বিশটিও বাইসে ম্যালা।
চাই, হুলুস্তুল করিচ্চা। অন হাজার হাজার মাইনশের বিত্তে কেমনে যাইবি। মাইনশের চঁডা খাই মরি যাইবি। চুপ্পেচাপ্পে বই থাক। খালদা জিয়ার কতা শ্যাষ অইলে মাইনশে চলি গেলে আস্তেদীরে যামু আণ্ডা। চাই থাম ভাই, কী ক হুনি।
আমি মুখ ফিরালাম তন্ময় থেকে। দৃষ্টি আবার ডায়াসে। বৃষ্টিও যেন যৌবন পেল তখন। ঝরছে মুষলধারে। হঠাৎই মাইকে শুনতে পেলাম বৃষ্টির কথা। তিনি বলছেন।
এই বৃষ্টি কীসের বৃষ্টি? রহমতের বৃষ্টি।
তার কথা শুনেই যেন আরও জোরে বইতে লাগলো বাতাস। সাথে বৃষ্টির বেগ। হাতিয়াকে ঘিরে তার দল আর সরকারের নেয়া নানান কর্মসূচি তিনি জানাচ্ছেন।
আধাঘণ্টা বা তারও কমসময় তিনি বললেন। জনগণের করতালি আর হর্ষধ্বনিতে শেষ করছেন তিনি। মানুষের উদ্বেল ভাবাবেগে তিনি শেষ করলেন।
খোদা হাফেজ। সবাই ভালো থাকবেন। আগামী নির্বাচনে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল মনোনীত প্রার্থী আপনাদের সন্তান, আপনাদের স্বজন, ফজলুল আজিমকে ধানের শীষে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন। আল্লাহ হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
সাথে সাথে হাজারো মানুষের স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে কলেজ প্রাঙ্গন। বৃষ্টি আর বাতাসও যেন সেদিন কণ্ঠ মিলিয়েছিলো সবার সাথে।
আমার চোখ তখন ঘুরছে চারপাশে। ব্যানারে, ফেস্টুনে। যেখানে লেখা সময়ের স্বাক্ষর।
“খালেদা জিয়া ভয় নাই – রাজপথ ছাড়ি নাই”
অবাক নয়নে সব পড়ছি। মানুষের চোখ আর মুখের নানান অভিব্যাক্তি আমাকে ভাবাচ্ছে। আমি যেন দেখা সব মুখস্থ করার চেষ্টা করছি। পড়ে যাচ্ছি সব আপন মনে।
“সিল মারো ভাই সিল মারো – ধানের শীষে সিল মারো”
অগণিত মানুষের তুমুল বিজয় ধ্বনিতে বিদায় নিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। পশ্চিমের আকাশও তখন সূর্যকে গিলে খেতে প্রস্তুত। মানুষ ফিরছে ঘরে।
দীপ কলেজের মাঠ বড়। তবে, মাঠে প্রবেশের গেইট ছোট। আমাদের লক্ষ্য, গেইট। হাঁটছি দু’ভাই। পায়ে পা টিপে।
আমার জুতা হারিয়েছে। তন্ময়ের বাংলা বই ভিজে গেছে। হাতে হাত রেখে আমরা হাঁটছি। ধীরে ধীরে এগুচ্ছি।
হঠাৎই হট্টগোল। বাইরে বেরুবার গেইটে। চিৎকার করে কাঁদছে কেউ। কেউ না অনেকেই। তুমুল উত্তেজনা।
হুড়মুড় করে বের হতে গিয়ে পদতলে পিষ্ট হয়েছেন কেউ কেউ। তাদের মৃত্যু মনে কাঁপন ধরিয়েছে আমাদের দু’ভাইয়ের। আমাদের গতি আরও শ্লথ হলো। ঠিক যখন সন্ধ্যা হবে হবে করছে, তখন বের হলাম আমরা দু’ভাই।
ধীরে ধীরে কলেজ গেইট পার হয়ে, হেঁটে হঁটে ওছখালী। তারপর খবির মিয়া বাজারের দিকে আমার পা। আমি আর আজ খাশের হাটে ফিরবো না।
পদদলিত হয়ে মৃত্যুর আতঙ্ক তখন চারপাশে। চাপাা ভয় গায়ে হিম ধরাচ্ছে। কে পড়লেন, কীভাবে পড়লেন পায়ের নিচে, তা ভাবতেই শিউরে উঠছিলাম, আমরা দুই ভাই।
আমার গতিও কাকা বাড়ীর দিকে। কাকা হয়তো বকবেন। তবে গায়ে হাত তুলবেন না। তা আমি জানি।
আব্বা রেগে আগুন হবেন। কেন না বলে গিয়েছি জনসভায়। তাও সাথে করে তন্ময়কে নিয়ে গেলাম। যদি কোন বিপদ হতো। কী উত্তর দেবো।
খবির মিয়া বাজারের দিকে ফিরছি আমরা। বৃষ্টি নেই। এই সন্ধে তখন হবে হবে করছে। কীভাবে সামলাবো আগামী বিপদ তা ভাবছি। কখনো ভাবছি দেশের প্রধানমন্ত্রীর কথা।
অন্ধকার বাড়ছে। আমাদের চলার গতি যেন আরও গতি পেলো। তন্ময় কাঁদছে। বেচারা ভয় পেয়েছে ভীষণ। নিজেকেই অপরাধী ভাবছি আমি। কেন যে আসতে গেলাম।
পদদলিত হয়ে মৃত্যুর খবর তখনো ভয়ে কাঁপন ধরাচ্ছিলো শিশুমনে। যখন কাকাবাড়ী কাছাকাছি। তখনই আবার পাখার ঘূর্ণি আওয়াজ।
রাস্তার দু’ধারে সারি সারি বড় কড়ই গাছেরও অনেক উপরে তখন হেলিকপ্টার। আমি আর তন্ময় দাঁড়িয়ে গেলাম। রাস্তা পেরিয়ে দৌড়ে নামলাম, ধানক্ষেতে।
উড়ে তখন দূরে যাচ্ছে হেলিকপ্টার। তন্ময় হাত তুলে টাটা দিলো। আমিও সঙ্গী হলাম। বিদায় জানালাম দেশের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে।
হেলিকপ্টার তখন দৃষ্টিসীমার বাইরে। দু’হাতে চোখ কচলেও আর দেখা যায় না। আমাদের দু’জনের পা ডুবেছে ধানক্ষেতের কাদা মাটিতে। আমার ফুলপ্যান্ট তখন কাদায় ভর্তি। জুতো হারিয়েছি আগেই।

তন্ময়ের পা ছাড়িয়ে হাফপ্যান্ট অবধি ছুঁয়েছে কাদামাটি। আমরা দু’ভাই দাঁড়িয়ে মুখোমুখি। হেলিকপ্টারের আওয়াজও আর নেই। চারপাশে যেদিকে চোখ যায় অবারিত ধান ক্ষেত।
পাকা ধানের গন্ধে ম ম করছে চারপাশ। ধানের শীষ এসে লাগছে হাতে। চুলকাচ্ছে কখনো। ধানপোকার উড়াউড়ি তখন আর চোখে লাগছে না। রাজ্যের অন্ধকার নামলো চারপাশে।
সেদিন রাতের দিকে কাদা মাখামাখি হয়ে কাকাবাড়ীতেই ফিরেছিলাম । আমার পিঠে বেতের আওয়াজ পড়েনি। কাকা আমাকে মারেননি।
তবে মার খেয়েছে তন্ময়। বাঁশের কঞ্চির বেশ কয়েক ঘা পড়েছে তার পিঠে। লজ্জা আর ভয়ে আমার মাথা কাটা যাচ্ছিলো। একটাই অপরাধ। এতো ছোট বয়সে কেন গেলাম সমাবেশে। যদি পদদলিত হতাম আমরা?
আজ বেগম খালেদা জিয়ার জীবন সমাপ্ত হলো। জীবন বড় অদ্ভুত। আজ এতো বছর পরে, তার প্রয়াণের সংবাদ পড়তে হবে টিভিতে।
পড়তে গিয়ে আমি যেন ফিরে যাবো আজ থেকে সেই বাইশ তেইশ বছর আগের শৈশবে। বেগম খালেদা জিয়াকে প্রথম সামনে থেকে দেখা। সেই স্মৃতি ভেসে উঠবে আমার মানসপটে।
সাংবাদিকতা পেশায় এসে বেশ কবার তার সংবাদ সম্মেলনে গিয়েছি। তবে বেগম খালেদা জিয়াকে দেখার মতো শৈশবের সেই তুমুল আগ্রহ আর কাজ করেনি।
তখন বুঝেছি, বড় হয়ে গিয়েছি। অনুভুতিগুলোও শৈশবের মতো আর তাজা নেই। ভোঁতা হয়ে গিয়েছে।
মহান রাব্বুল আল আমিন, আমাদের সবাইকে শান্ত করুন। স্থির করুন আমাদের। তার প্রয়াণে শ্রদ্ধাভরে সম্মান জানাই।
আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য অনেক অনেক দোয়া। পরজনমে আল্লাহ উনাকে শান্তিতে রাখুন।
পড়ুন: খালেদা জিয়ার মৃত্যু রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল
দেখুন: খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকাহত ছাত্রদল সভাপতি রাকিব
ইম/


