দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার বুলাকীপুর ইউনিয়নের কুলানন্দপুর গ্রামের করতোয়া নদীর পাড় এখন আর কেবল একটি নদীপথ নয়, বরং উত্তরবঙ্গের অপরাধ জগতের এক অঘোষিত ‘জমজমাট জুয়ার আসর’। মাসের পর মাস এখানে কোটি কোটি টাকার জুয়া চললেও রহস্যজনক কারণে নীরব পুলিশ প্রশাসন। মাঝে মাঝে পুলিশের ‘আইওয়াশ’ অভিযানে চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও অদৃশ্য সুতার টানে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে জুয়া সাম্রাজ্যের মূল গডফাদাররা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কার মদদে এই ওপেন চ্যালেঞ্জ?
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুলানন্দপুর গ্রামের দুর্গম নদী তীরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। প্রতিদিন দুপুর গড়াতেই এখানে বসছে জুয়ার আসর। দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও বগুড়াসহ পার্শ্ববর্তী ৫-৬টি জেলা থেকে সিএনজি ও মোটরসাইকেলের নিয়ে হাজির হচ্ছে পেশাদার জুয়াড়িরা। দুর্গম এলাকা হওয়ায় দূর থেকেই প্রশাসনের গতিবিধি নজরদারি করতে পারে সিন্ডিকেটের নিয়োগ করা ‘লাইনম্যান’রা। ফলে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই জেনে যায় মূল হোতারা।
মাঝে মধ্যে পুলিশ প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করে কয়েকজনকে আটক করে বাহবা নিলেও কয়েক দিন যেতে না যেতেই ফের শুরু হয় আসর। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশের এই অভিযানগুলো কেবলই ‘রুটিন মাফিক’। আসরের প্রকৃত আয়োজক বা মাস্টারমাইন্ডদের কেন স্পর্শ করা হচ্ছে না, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—তবে কি প্রশাসনের কোনো গোপন আশকারা বা মাসোহারার বিনিময়ে এই অপরাধ সাম্রাজ্য টিকে আছে?
এই জুয়ার আড্ডা থেকে নদীর তীরে বসছে নেশার আসরও। এতে যেমন ধ্বংস হচ্ছে উপজেলার তরুণ প্রজন্ম, তেমনি এলাকায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চুরি ও ছিনতাই। প্রতিবাদ করলে উল্টো মামলা বা হামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে সাধারণ গ্রামবাসী ও সাংবাদিকদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “জুয়াড়িরা বিভিন্ন এলাকা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বীরদর্পে গ্রামে ঢোকে। পুলিশ মাঝেমধ্যে আসে, নাটকের মতো কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যায়, কিন্তু মহাজনরা সব সময় সেফ থাকে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “জুয়া খেলার জায়গাটি মূলত তিনটি থানার সীমান্ত এবং একটি দুর্গম চর অঞ্চল। যখনই আমাদের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হয়, তখন তারা দাবি করে যে জায়গাটি পীরগঞ্জ থানার অধীনে। আবার অন্য পাশ থেকে গেলে তারা আমাদের সীমানা বলে দাবি করে। মূলত সীমানা জটিলতার সুযোগ নিয়ে তারা এই কাজগুলো করে। প্রায় তিন মাস আগে সেখানে একটি বড় অভিযান চালানো হয়েছিল, যেখানে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে এবং আমরা মামলা দায়ের করি। আমাদের দিক থেকে যাতে কেউ নদী পার হয়ে ওই এলাকায় যেতে না পারে, সেজন্য আমরা নিয়মিত চেকপোস্ট বসাই। তবে এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় পীরগঞ্জ ও ঘোড়াঘাট থানার যৌথ অপারেশন ছাড়া এটি পুরোপুরি নির্মূল করা বেশ কঠিন। আমরা পীরগঞ্জ থানার ওসির সাথে এ বিষয়ে কথা বলেছি যাতে খুব দ্রুত একটি যৌথ অভিযান পরিচালনা করা যায়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই চক্রের সাথে জড়িতদের অধিকাংশই পার্শ্ববর্তী পীরগঞ্জ এলাকার। আমরা যাওয়ার সাথে সাথেই তারা অন্য থানায় পালিয়ে যায়। পুলিশ হয়তো গিয়ে তাদের সরিয়ে দেয়, কিন্তু পুলিশ চলে আসার পর তারা আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। তাই পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয়রা যদি আমাদের সঠিক সময়ে তথ্য দিয়ে সহায়তা করে, তবেই এই অপরাধীদের স্থায়ীভাবে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।”
পড়ুন : দিনাজপুর প্রেসক্লাবের ৪৩ তম বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত


