হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কাজীহাটা গ্রামের নাজমা আক্তার হত্যা মামলার আসামীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন নিহতের কলেজ পড়ুয়া মেয়ে নার্গিস আক্তার। শনিবার (৯ মে) সকালে হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি প্রশাসনের প্রতি আসামীদের দ্রুত গ্রেফতার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে নার্গিস আক্তার জানান, তার পিতা জসিম উদ্দিন প্রবাসে থাকায় তিনি মা নাজমা আক্তার, সৎমা সিতারা খাতুনসহ ভাই-বোনদের নিয়ে একই বাড়িতে বসবাস করতেন। তবে তাদের সহায়-সম্পত্তির ওপর লোলুপ দৃষ্টি দেন তার চাচা তোরাব আলী। এ নিয়ে তোরাব আলী বিভিন্ন সময় তাদের ওপর নির্যাতন চালাতেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, গত বছরের ১০ অক্টোবর তোরাব আলী ও তার পরিবারের লোকজন নাজমা আক্তার এবং সিতারা খাতুনকে কুপিয়ে আহত করেন। এতে তারা হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং আদালতে মামলা দায়ের করেন। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েকদিন পর ১৮ অক্টোবর বিকেল ৩টার দিকে তোরাব আলী, তার পরিবারের সদস্য এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজন নিয়ে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে নাজমা আক্তার ও সিতারা খাতুনকে বেধড়ক মারধর করা হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে তারা বাহুবল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
নার্গিস আক্তার জানান, বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ২০ অক্টোবর দুপুরে থানা প্রাঙ্গণে সালিশ বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি। এরপর ওইদিন রাত আনুমানিক ৯টা ২৫ মিনিটে তার মা ঘর থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। রাত ১১টা ৫০ মিনিটে পাশ্ববর্তী আব্দুল হান্নান মেম্বারের বসতবাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে বাঁশঝাড়ে নাজমা আক্তারকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, “আমার মায়ের হাত পিছমোড়া করে বাঁধা ছিল, মুখে স্কচটেপ লাগানো ছিল এবং গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। ওড়না পেঁচিয়ে তাকে বাঁশঝাড়ের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল। আমরা নিশ্চিত হই, তাকে হত্যা করা হয়েছে।” পরে বাহুবল থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।
নার্গিস আক্তার আরও জানান, তার পিতা দেশে ফেরার পর ২৫ অক্টোবর তিনি বাদী হয়ে বাহুবল মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৩/৪ জনকে আসামী করা হয়। বাহুবল মডেল থানার মামলা নং-১৬, তাং-২৫/১০/২০২৫ইং, ধারা-৩০২/৩৪ পেনাল কোড। মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় পিবিআই হবিগঞ্জ জেলার পুলিশ পরিদর্শক রাজিব কুমার দাশকে।
তবে সংবাদ সম্মেলনে নার্গিস আক্তার অভিযোগ করেন, তদন্ত কর্মকর্তা রাজিব কুমার দাশ আসামীদের গ্রেফতার না করে গড়িমসি করছেন। তিনি বলেন, “তদন্ত কর্মকর্তা আমার কথা না শুনে উল্টো আমাকে প্রধান আসামী তোরাব আলীর নাম ভুলে যেতে হুমকি দেন।” তিনি আরও দাবি করেন, তদন্ত কর্মকর্তা এখন পর্যন্ত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেননি এবং উল্টো তাকে ও তার পরিবারকে বারবার কার্যালয়ে ডেকে হয়রানি করছেন।
নার্গিস আক্তারের অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তা তার মামা আব্দুল গনিকে ডেকে নিয়ে আটক করে জেল হাজতে পাঠান। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। এতে নাজমা আক্তার হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
নার্গিস আক্তার বলেন, “আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা বিভিন্ন সময় আমাকে হত্যার চেষ্টা করছে। মাকে হত্যার পর এখন তারা আমাকেও মারতে চায়।” তিনি জানান, প্রায় এক মাস আগে আসামী সেলিম রেজা ও সাইফুল ইসলাম লিটন মোটরসাইকেল নিয়ে এসে তাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলে তিনি আহত হন। বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তাকে জানালেও তিনি ঘটনাস্থলে আসেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থল থেকে মোটরসাইকেলটি ফেলে রেখে আসামীরা পালিয়ে যায়। পরে বাহুবল থানা পুলিশ স্থানীয় চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের উপস্থিতিতে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। এরপর থেকে পরিবার নিয়ে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে নার্গিস আক্তার নাজমা আক্তার হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে দ্রুত আসামীদের গ্রেফতার এবং নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য হবিগঞ্জ পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।


