রংপুর নগরীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কৈলাশ রঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয় এখন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের বর্তমান এডহক কমিটির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দোকান এবং বিদ্যালয়ের জায়গা বরাদ্দের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, গত ৭ মে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতের আঁধারে বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন প্রাচীর ভেঙে একটি দোকান ঘর উন্মোচন করায় এই দুর্নীতি তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। তথ্য মতে, সরকারি প্রবিধান অমান্য করে এবং কোন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন একটি দোকান স্থানীয় আখতার হোসেন বাদল নামের এক ব্যক্তির কাছে ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকায় বিনিময়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আশরাফুল আলম এবং এডহক কমিটির সভাপতি মাহমুদার রহমান সোনা যোগসাজশ করে মাত্র ৬০ লক্ষ টাকা স্কুল ফান্ডে জমা করেছেন। বাকি ৭০ লক্ষ টাকা তারা নিজেরা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে । এই বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
সূত্রমতে সম্প্রতি স্থানীয় একটি পত্রিকায় বিদ্যালয়ের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার পূর্বেই বর্তমান এডহক কমিটির সভাপতি মাহামুদার রহমান সোনা তড়িঘড়ি করে রাতের আঁধারে তার নিজস্ব লোকজন দিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন দেয়াল ভেঙে পূর্বনির্মিত শাটার লাগানো দোকান বরাদ্দ দেন। এই ঘটনার পর বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অনিয়ম কেবল প্রধান ফটকেই সীমাবদ্ধ নয়।শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা করার জায়গাটুকুতেও বিশাল আকারের গোডাউন ঘরনির্মাণ করে এড হক কমিটির সভাপতি নিজেই বরাদ্দ নিয়েছেন। ফলে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের প্রবেশ পথ সংকুচিত হয়েছে। এছাড়াও শালবন মিস্ত্রি পাড়ায় অবস্থিত বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ২৪টি দোকান লিজ দেওয়া এবং বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও এডহক কমিটির সভাপতি।
সূত্রমতে গত ৭ নভেম্বর ২০২৩ থেকে এ যাবৎ অ্যাড হক কমিটি চার বার মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে প্রতিবারই সভাপতি থাকেন মাহামুদার রহমান সোনা এবং শিক্ষক প্রতিনিধ থাকেন ধর্মীয় শিক্ষক আশরাফুল আলম।এই সময়ে মহামান্য হাইকোর্ট কমপক্ষে তিনবার এই কমিটিকে অবৈধ ঘোষণা করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব প্রদান করেন। কিন্তু সেইসব আদেশকে অমান্য করেই নির্দিষ্ট মেয়াদ সম্পূর্ণ করেছে এই এড হক কমিটি। এই বৈধ-অবৈধ সময়ের মধ্যে এই এড হক কমিটি প্রকৃত দায়িত্ব ও কর্তব্য বেমালুম ভুলে গিয়ে বিদ্যালয়ের স্থায়ী-অস্থায়ী সম্পত্তি হস্তান্তর করে ভুয়া ভাউচার এর মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি টাকার পকেটস্থ করেছে। তারা বর্তমানে বিদ্যালয়ে ক্যাম্পাস বন্ধ করে বহুতল বিশিষ্ট মার্কেট করার পরিকল্পনা করছেন।
বর্তমানে বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার পরিবেশ নেই। যে কারণে অভিভাবক মহলও অসন্তুষ্ট থাকায় ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ও শিক্ষক কর্মচারীদের তুলনায় প্রায় সমানে সমান।
এছাড়াও বিদ্যালয়টির সরকারি একাডেমিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী এই একাডেমিক ভবনটি বিদ্যালয় চত্বরে নির্মাণ করার কথা থাকলেও, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেটি শহর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে শালবন মিস্ত্রি পাড়ার খেলার মাঠে নির্মাণ করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে যাচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা ।
বিদ্যালয়টির এই বেহাল দশা ও দুর্নীতির কারণে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। তারা অতি দ্রুত বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এবং তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পদ এভাবে লুটপাট হতে থাকলে এর ঐতিহ্য ও শিক্ষার পরিবেশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে তারা জেলা প্রশাসক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পড়ুন- হামে মৃত্যু ৩৫২ শিশুর পরিবারকে ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে রিট


