নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর উপজেলাবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এবার বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে? পূর্বধলার জারিয়া-ঝাঞ্জাইল থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আগামীকাল ১৩ মে (বুধবার) সরজমিনে এলাকা পরিদর্শনে আসছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ জনপ্রতিনিধিসহ কর্মকর্তারা। এ সফরকে কেন্দ্র করে দুর্গাপুর-কলমাকান্দা অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মাঝে বইছে আনন্দের জোয়ার।
অফিসিয়াল সফরসূচি অনুযায়ী, বুধবার (১৩ মে) সকাল ৮টায় ঢাকা থেকে সড়কপথে নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন ডেপুটি স্পিকার। তার সাথে থাকবেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এমপি, সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনসহ রেলের কর্মকর্তাবৃন্দ।
বেলা ১২টায় প্রতিনিধি দলটি জারিয়া-ঝাঞ্জাইল রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন করবেন। এরপর বেলা ২টায় বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি পরিদর্শন শেষে বেলা ৩টায় দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে স্থানীয় সুধীজনদের সাথে মতবিনিময় সভায় মিলিত হবেন।
দুর্গাপুর ও বিরিশিরি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য লীলাভূমি। এখানে রয়েছে স্বচ্ছ নীল জলের লেক, চীনামাটির পাহাড়, খরস্রোতা সোমেশ্বরী নদী এবং দিগন্তজোড়া গারো পাহাড়। পর্যটন শিল্পের বিকাশে রেল যোগাযোগ এখানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। বর্তমানে সড়কপথের নাজুক অবস্থার কারণে পর্যটকরা যাতায়াতে চরম ভোগান্তির শিকার হন। রেল যোগাযোগ চালু হলে ঢাকা থেকে সরাসরি নিরাপদ ও আরামদায়ক যাতায়াত সম্ভব হবে, যা স্থানীয় পর্যটনকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও রেললাইন সম্প্রসারণের গুরুত্ব অপরিসীম। দুর্গাপুরের বিজয়পুরের মূল্যবান চীনামাটি, সোমেশ্বরী নদীর বালি ও পাথর সারা দেশে পরিবহনের জন্য রেললাইন হবে সবচেয়ে সাশ্রয়ী মাধ্যম। এর ফলে সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে।
অতীতে আশার আলো দেখানো হলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় রেললাইন সম্প্রসারণের প্রস্তাবনা পুনরায় চালু হওয়ায় উচ্ছ্বসিত স্থানীয়রা। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী। রেললাইন হলে শুধু যাতায়াত নয়, এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও সারা বিশ্বের কাছে আরও সহজলভ্য হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী তাকদির হোসাইনের মতে, “ব্যবসায়ী হিসেবে আমাদের জন্য রেললাইন হবে আশীর্বাদ। বর্তমানে সড়কপথে মালামাল আনতে গিয়ে অনেক সময় পণ্য ভেঙে যায় বা নষ্ট হয়। ট্রেনে যাতায়াত নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হওয়ায় ব্যবসায়িক খরচ কমবে এবং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেও বাঁচা যাবে।”
আব্দুল কুদ্দুস নামে আরেক ব্যবসায়ী জানান, “আমরা যুগ যুগ ধরে রেললাইনের অপেক্ষা করছি। জারিয়া থেকে প্রায় ১২-১৫ কিলোমিটার রেললাইন বাড়লে আমরা সরাসরি ঢাকার সাথে যুক্ত হতে পারব। এতে আমাদের ব্যবসা এবং পর্যটন দুটোই লাভবান হবে।”
শিক্ষার্থী মাঝেও লক্ষ্য করা গেছে অজানা প্রাপ্তির এক কৌতুহল। শিক্ষার্থী রাজশ্বেরী রায় আরাধ্য বলেন, “আমি শীঘ্রই ময়মনসিংহে কলেজে ভর্তি হব। দুর্গাপুর থেকে সরাসরি ট্রেন থাকলে আমাদের যাতায়াত অনেক সহজ ও আরামদায়ক হবে। এটি শুধু আমার নয়, দুর্গাপুরের সকল শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষার দুয়ার খুলে দেবে।”
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হাজং সম্প্রদায়ের নেত্রী নন্দিতা হাজংয়ের মতে, “রেল চালু হলে আমরা খুব অল্প খরচে ঢাকা ও ময়মনসিংহ যাতায়াত করতে পারব। বর্তমানে বাসে যাতায়াতে অতিরিক্ত যে টাকা খরচ হয়, রেলপথে তা অনেক কমে আসবে। এটি আমাদের এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য বড় সুবিধা হবে।”
গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুল্লাহ আল মামুন মুকুলের জানান, “দুর্গাপুরের উৎপাদিত ধান, পাহাড়ি ফলমূল এবং বিজয়পুরের সাদা মাটি ও বালি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবহনে রেল হবে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। এতে কৃষকরা পণ্যের ভালো দাম পাবেন এবং এলাকার অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে।
রেল মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তা ব্যক্তিদের সফরটি দুর্গাপুরবাসীসহ নেত্রকোনার মানুষের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত হতে যাচ্ছে। জারিয়া-ঝাঞ্জাইল থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারিত রেললাইন কেবল একটি যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং এটি এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তির চাবিকাঠি। সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপে সাধারণ মানুষের মাঝে এখন শুধুই দ্রুত বাস্তবায়নের অপেক্ষা।


