বিজ্ঞাপন

সীতাকুণ্ডে ধর্ষণের পর সালিশি বৈঠকে উল্টো ধর্ষিতার পিতাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল ভাটিয়ারি গ্রামে এক কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় বেরিয়ে আসছে একের পর এক গা শিউরে ওঠা ও নির্মম সব তথ্য। ধর্ষণের শিকার হয়ে ওই কিশোরী গর্ভবতী হয়ে পড়েছিল এবং পরবর্তীতে তার গর্ভের সাত মাসের সন্তানটি হাসপাতালে নিয়ে নষ্ট করা হয়েছে। (চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যা ‘স্টিলবার্থ’ বা মৃতজাতক)।

বিজ্ঞাপন

এই চরম অমানবিক ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ভাটিয়ারী পোর্টলিংক কনটেইনার ডিপোর পূর্বে মনাঘোনা নামক পাহাড়ি এলাকায়।

গত সোমবার (১৮মে) এ ঘটনায় কিশোরীর পিতা মোহাম্মদ আবদুর রশিদ বাদি হয়ে সীতাকুণ্ড মডেল থানায় চারজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
নারী ও শিশু নিযাতন আইনে এ মামলায় আসামিরা হলেন, মাহাবুবুল আলম, ফয়জুল হক, রিপন ও চান মিয়া ওরফে চান্দু মিয়া।

মঙ্গলবার (১৯ মে) এজাহারনামীয় তিন নাম্বার আসামি রিপনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে প্রেরণ করেন মামলার তদন্তকারী অফিসার।তবে তাকে আটকের পর থানা থেকে ছাড়িয়ে নিতে কিছু উৎশৃখল যুবক চেষ্টা করে ।

এদিকে আইনের আড়ালে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে বসেছিল প্রহসনের সালিশি বৈঠক। সেখানে উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারকে এলাকা ছাড়ার হুমকি ও তাদের ঘরবাড়ি-দোকান ভাঙচুরের চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বুধবার (২০মে) কিশোরীর পিতাকে আসামিরা জিম্মি করে আদালতে নিয়েছে মামলা প্রত্যাহারের জন্য। হুমকি দিয়েছে মামলা তুলে না নিলে এলাকা ছাড়তে হবে। আবার প্রলোভন দিচ্ছে কিশোরীকে বিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার।

সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় থানা মামলা হয়েছে। এজাহারনামীয় আসামি রিপনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি ওই এলাকার আবু তাহের সাওদাগরের ছেলে। অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তার চেষ্ঠা চলছে। তবে সামাজিক শালিসে ধর্ষণ ঘটনার বিচার করার কোন সুযোগ নাই। এ বিচার যারা করছে তাদেরও বিধি মোতাবেক আইনের আওতায় আনা হবে।

ঘটনার পর থানায় মামলা হলেও এখনো মূল অপরাধী অধরাই রয়ে গেছে। ধর্ষিতার কিশোরীর ভবিষ্যৎ চিন্তার কথা বিবেচনা করে অপরাধী ও ধর্ষিতার পিতাকেই ৫০ হাজার টাকা করে সমপরিমাণ জরিমানা করেছে। তবে বিচাররের পর ১০দিন পেরিয়ে গেলেও ধর্ষণকারী টাকা পরিশোধ করেনি বলে জানান কিশোরীর মা ফরিদা।

ফরিদা বলেন, অভাব অনটনের সংসার। পাহাড়ের কৃষি কাজ করে। তার স্বামী পান-চায়ের দোকান করে কোনভাবে দিনযাপন করেন। তাদের স্থানীয় কোন ভিটে-মাটিও নাই। তার পনের (১৫) বছরের মেয়ে বাড়ির পাশে সিডিএ আবাসিক এলাকার খালি মাঠে গরু দেখাশুনা করতো। ওখানে স্থানীয় ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ মাহাবুল আলম তাকে ফুসলিয়ে গত বছরের নভেম্বর মাসের দিকে একটি পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করে। এতে সে সাত মাসের অন্তসত্বা হয়।

এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গত ৮মে তাকে স্থানীয় কিছু যুবক (ধর্ষণকারীর অনুসারী) জোর করে হুমকি দিয়ে চট্টগ্রাম বেসরকারি একটি হাসপাতালে নিয়ে গর্ভের সন্তানটি নষ্ট করে।এসময় ধর্ষণকারী পক্ষে নিয়ে স্থানীয় কিছু যুবক কিশোরীর বাবার দোকান ও বসতঘর ভাংচুরের চেষ্টা চালায়। সামাজিক বৈঠক মানতে হবে বলে হুশিয়ারী দেন। তা না হলে এ এলাকা থেকে চলে যেতে বাধ্য করেন।

সালিশি বৈঠকটি ওই এলাকায় নব নির্মিত যুবদলের কাযালয়ে অনুষ্ঠিত হয় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাসেম ও কিশোরীর মা ফরিদা।

গত এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত সালিশিএ বৈঠকে ধর্ষণকারী মাহাবুবুল আলমকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হয়। এছাড়া কিশোর পিতাকে সমপরিমান জরিমানা করা হয়। যাতে করে কিশোরীকে বিয়ে দেওয়া যায়। তবে ধর্ষণকারী মাহাবুবুল জরিমানার টাকা পরিশোধের শেষ তারিখ ছিলো গত ১০মে। এতে সে তা পরিশোধ না করে তার অনুসারীদের দিয়ে উল্টো কিশোরী ও তার পরিবারকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল ভাটিয়ারী ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হক (মামলার ২ নং আসামি) বলেন, আমাকে কেন মামলার আসামি করা হয়েছে জানি না। তবে এ নেতার দাবি সালিশি বৈঠক দলীয় কাযালয়ে করেনি। ধর্ষিতার বাড়ির সামনে রাস্তায় হয়েছে। শালিসে তিনিও ছিলেন বলে নিশ্চিত করেন।
তিনি আরও বলেন, সালিশি বিচার মেনে নিতে উত্তেজিত কিছু জনতাকে ধর্ষিতার বাবার বাড়ি ও দোকান ভাঙার চেষ্ঠা করেছিলো কিন্ত তা আমাদের প্রতিরোধে করতে পারেনি।

স্থানীয় বাসিন্দা সুলতানা জাহান বলেন, মাহাবুবুল আলম নামের এক বৃদ্ধের লালসার শিকার হয়ে কিশোরীটি সম্ভ্রম হারানোর পাশাপাশি গর্ভধারণ করে। পরবর্তীতে গর্ভের সন্তানটি নষ্ট (স্টিলবার্থ) হয়ে গেলে বিষয়টি জানাজানি হয়। এরপরই ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চেষ্টা চালায় স্থানীয় কিছু যুবক। তারা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার কেড়ে নিয়ে স্থানীয় দলীয় কার্যালয়ে এক সালিশি বৈঠক করেছে। সেখানে কোনো আইনি এক্তিয়ার ছাড়াই তথাকথিত বিচারকরা এক অদ্ভুত ও অপমানজনক সিদ্ধান্ত নেন। তারা ধর্ষণকারী এবং ভুক্তভোগী কিশোরীর অসহায় পিতা উভয় পক্ষকেই ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করে পুরো ঘটনাটি রফাদফা করার চেষ্টা চালান।

এদিকে একাধারে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, গর্ভের সন্তান নষ্ট হওয়া এবং পরবর্তীতে ঘরবাড়ি হারানোর আতঙ্কে পুরো পরিবারটি এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। নির্যাতিতা কিশোরীর মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নায় জঙ্গল ভাটিয়ারি গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

পড়ুন- ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করব: ট্রাম্প

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন