স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর বরগুনা কার্যালয় থেকে প্রায় ৮৫ কোটি টাকা ব্যায়ে “বরগুনা জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো প্রকল্প”-এর আওতায় ১৪টি সড়ক নির্মাণ কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওটিএম (ওপেন টেন্ডারিং মেথড) পদ্ধতিতে আহ্বান করা এ টেন্ডারে বরগুনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার শতাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। যাচাই-বাছাই শেষে সরকারি ক্রয় বিধিমালা-২০২৫ ও ইজিপি পদ্ধতি অনুসরণ করে সর্বনিম্ন দরদাতাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
এলজিইডি সূত্র জানায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের এ প্রকল্পের আওতায় বরগুনার বিভিন্ন উপজেলায় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনলাইনভিত্তিক ইজিপি সিস্টেমে দরপত্র জমা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
তবে টেন্ডার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরই আমতলী ও তালতলী অংশের প্রায় ২৭ কোটি টাকা মূল্যের চারটি দরপত্রের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন তালতলীর বাসিন্দা ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন। তিনি প্রয়াত বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) এবং বরগুনা জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। একই সঙ্গে তিনি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবেও নিজের পরিচয় দিয়ে থাকেন।
যে সকল টেন্ডার কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ ওঠে সেই টেন্ডারগুলি মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ প্রদানের জন্য বরগুনা জেলা কার্যালয় থেকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে প্রকিউরমেন্ট বিভাগে প্রেরণ করা হয়। সেখানেও যাচাই বাছাই শেষে কোন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় পুনরায় বরগুনা কার্যালয়কে স্ব স্ব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কার্যাদেশ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়।
অভিযোগে যা বলা হয়েছে:
লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আমতলী ও তালতলী উপজেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের চারটি কাজে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালার লঙ্ঘন, অবৈধ আর্থিক লেনদেন, জনস্বার্থবিরোধী নিম্নমানের কাজের আশঙ্কা, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বৈষম্য ও অনিয়ম করা হয়েছে।
ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন অভিযোগ করেন, এলজিইডি বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান, জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী শ্যামল কুমার গাইন ও প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী রাজিব শাহ তাঁদের নিকটাত্মীয়দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এম এ লুৎফুল কবির ট্রেডার্স, এমএস নুর কনস্ট্রাকশন, লেলিন-দীপ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) ও নিশিত বসু ট্রেডার্সের সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের ব্যক্তিগত যোগাযোগও রয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য:
কাজ পাওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বলেন, পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াই ইজিপি ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে।
এবিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এমএ লুৎফুল কবির ট্রেডার্স এর প্রতিনিধি মো. সিরাজ বলেন, “আমরা নিয়ম মেনেই টেন্ডারে অংশ নিয়েছি। কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নে যোগ্য বিবেচিত হওয়ায় কাজ পেয়েছি। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রভাবের সুযোগ নেই। ইজিপি সিস্টেমে অনলাইনের মাধ্যমে দরপত্র জমা ও মূল্যায়ন করা হয়েছে। সর্বনিন্ম দরদাতা এবং যোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কার্যাদেশ পেয়েছি। রাজনৈতিক পরিচয় টেনে এনে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।”
একই টেন্ডার কার্যক্রমে অংশ নেওয়া আল-মামুন এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি মো. রাজন বলেন, আমিও এই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে ছিলাম। অন্যান্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে কম্পিটিশনে আমরা হেরে গেছি তাই কাজ পাইনি। এখন যদি ইজিপিতে বাস্তবায়িত টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলি তাহলে সেটা হাস্যকর হবে। এখানে কোন অনিয়মের সুযোগ নেই।
সরকারি ক্রয় বিধিমালায় কী আছে:
সরকারি উন্নয়ন কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী। সাধারণত নির্দিষ্ট সীমার অধিক টাকা মূল্যের কাজ ওটিএম পদ্ধতিতে আহ্বান করা হয়। এরপর ইজিপি সিস্টেমের মাধ্যমে অনলাইনে দরপত্র জমা ও মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়। সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও কারিগরি ও আইনগত যোগ্যতা না থাকলে প্রতিষ্ঠান অযোগ্য বিবেচিত হতে পারে। টেন্ডার মূল্যায়নে লাইসেন্স, অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা, চলমান কাজ ও পূর্ব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হয়।
অভিযোগের পক্ষে মেলেনি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ:
অভিযোগে দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, নিম্নমানের কাজ ও টেন্ডার অনিয়মের কথা বলা হলেও এসব দাবির পক্ষে কোনো লিখিত বা কারিগরি প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি অভিযোগকারী।
এলজিইডি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনো কাজের বাস্তবায়ন পুরোপুরি শুরু হয়নি। ফলে “নিম্নমানের কাজ সম্পাদন” সংক্রান্ত অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে অবৈধ আর্থিক লেনদেন বা সরকারি ক্রয় বিধিমালা লঙ্ঘনেরও কোনো নথিপত্র অভিযোগে সংযুক্ত করা হয়নি।
কাজ না পেয়ে ক্ষোভ?:
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অভিযোগকারী ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন নিজেও এই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন। তিনি তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন “শাহরিস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড”-কে কাজ দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে তদবির করেন বলেও প্রমান পাওয়া গেছে। ওমর আব্দুল্লাহ শাহীনের মুঠোফোন থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান খানকে করা তদবিরের কিছু স্ক্রিনশট এই প্রতিবেদকের হাতেও এসেছে। সেখানে দেখা গেছে টেন্ডার শুরুর আগেই কাজ গুলো তিনি (ওমর আবদুল্লাহ শাহিন) পাস করিয়েছেন উল্লেখ করে তার মনোনীত ঠিকাদারের বাইরে যাতে কেউ না পায় সেই জন্য বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইজিপি সিস্টেম ও সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী তাঁর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ও কারিগরি সক্ষমতা প্রয়োজনীয় মানদন্ডে উপযুক্ত বিবেচিত হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটি কার্যাদেশ পায়নি। এরপর থেকেই তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিতে শুরু করেন বলে দাবি এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তার। এমনকি কাজ না পেলে “দেখে নেওয়ার” হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে ওমর আব্দুল্লাহ শাহীনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি বলেন, ১৭ বছর আমাদের দলীয় নেতাকর্মীরা মামলা হামলার শিকার হয়েছেন। তাদের মামলার খরচ ও তারা যাতে বেনিফিটেড হতে পারে সেই কারনে আমি নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে কাজগুলো চেয়েছি।
কী বলছে এলজিইডি?:
অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এলজিইডির বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ মোহা. নুরুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তদন্তে অভিযোগের স্বপক্ষে কোন প্রমান না পেলেও কথিত বিএনপি নেতার মান রক্ষার্থে বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলী করা হয়েছে। এলজিইডির দাবি, পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া ইজিপি ও সরকারি ক্রয় নীতিমালা-২০২৫ অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা এখনো পাওয়া যায়নি।
প্রকল্প অফিসের সহকারী প্রকৌশলী রাজিব শাহ বলেন, “পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া ইজিপি সিস্টেমে সম্পন্ন হয়েছে। এখানে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।”
জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী শ্যামল কুমার গাইন বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত। তদন্ত হলে সত্য বেরিয়ে আসবে।”
এলজিইডি বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান বলেন, “সরকারি ক্রয় বিধিমালা ও ইজিপি নীতিমালা অনুসরণ করেই দরপত্র মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে প্রকৃত তথ্য উঠে আসবে।”
কী বলছে সচেতন মহল ও সুশীল সমাজ?:
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে অভিযোগ-প্রতিঅভিযোগ নতুন কিছু নয়। তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া শুধু অনুমান নির্ভর অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
বরগুনা জেলা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক মো. হাসানুর রহমান ঝন্টু বলেন, বর্তমানে ইজিপি পদ্ধতিতে টেন্ডার কার্যক্রম অনেকটাই স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় আগের মতো সরাসরি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমেছে। তারপরও কোথাও অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বরগুনা জেলা শাখার সদস্য সচিব হুমায়ুন হাসান শাহীন বলেন, “দলের নাম ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করলে তার দায় দল নেবে না। কোনো ব্যক্তি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে কাজ না পেয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে সেটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। উদ্দেশ্য প্রণোদিত অভিযোগের মাধ্যমে যেন উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।”
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে তদন্তে কেউ অভিযুক্ত না হলে তাদেরকে স্বপদে বহাল করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।


