আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তাঁর উদ্যোগে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঈদকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা আজ থেকেই বিভিন্ন পণ্যের দাম কমিয়ে বিক্রি শুরু করেছেন।
শনিবার (২৩ মে) সকালে নগরের অন্যতম বৃহৎ বাজার রেয়াজউদ্দিন বাজারে “উৎসব ছাড়” কর্মসূচির উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক। এর মধ্য দিয়েই বাস্তবায়ন শুরু হলো তাঁর পূর্বঘোষিত প্রতিশ্রুতি— “উৎসবে কমবে দাম, বাড়বে আনন্দ”।
দেশের শীর্ষ পাইকারি বাজার রেয়াজউদ্দিন বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ছালামত আলী ও সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুস শুক্কুরের স্বাক্ষরিত চিঠি অনুযায়ী, এলাচির দাম প্রতি কেজিতে ৪ হাজার ৮০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৪ হাজার ২০০ টাকা করা হয়েছে। দারুচিনির দাম ৬০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫২০ টাকা করা হয়েছে। লবঙ্গের দাম ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে কমিয়ে ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিসমিসের দাম ৯৮০ টাকা থেকে কমিয়ে ৭২০ টাকা করা হয়েছে। আদার দাম ১৯০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৫০ টাকা করা হয়েছে। রসুনের দাম ১৪০ টাকা থেকে কমিয়ে ১১০ টাকা করা হয়েছে। পেঁয়াজের মানভেদে দাম ২৫ টাকা থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে। জিরার দাম ৭৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রেয়াজউদ্দিন বাজারে ভারতীয় জিরার দাম প্রতি কেজি ৬৫০ টাকা থেকে ১২ শতাংশ কমিয়ে ৫৭০ টাকা করা হয়েছে। মিষ্টি জিরার দাম ২৮০ টাকা থেকে ২০ শতাংশ কমিয়ে ২২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এলাচির দাম ৪ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ১২ শতাংশ কমিয়ে ৪ হাজার ১০০ টাকা করা হয়েছে। লবঙ্গের দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে ১ হাজার ৩৫০ টাকা করা হয়েছে। দারুচিনির দাম ৫৫০ টাকা থেকে ১৫ শতাংশ কমিয়ে ৪৭০ টাকা করা হয়েছে। গোলমরিচের দাম ১ হাজার ৩২০ টাকা থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে ১ হাজার ১৯০ টাকা করা হয়েছে। জায়ফলের দাম ১ হাজার টাকা থেকে ১২ শতাংশ কমিয়ে ৯০০ টাকা করা হয়েছে। ভারতীয় মরিচের দাম ৪২০ টাকা থেকে ৫ শতাংশ কমিয়ে ৪০০ টাকা করা হয়েছে। দেশি মরিচের দাম ৩২০ টাকা থেকে ১২ শতাংশ কমিয়ে ২৮০ টাকা করা হয়েছে। ভারতীয় হলুদের দাম ২৬০ টাকা থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে ২৪০ টাকা করা হয়েছে। দেশি হলুদের দাম ২৪০ টাকা থেকে ১৫ শতাংশ কমিয়ে ২১০ টাকা করা হয়েছে। ধনিয়ার দাম ১৯০ টাকা থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে ১৭০ টাকা করা হয়েছে।
উদ্বোধনী কার্যক্রম ও বাজার পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন বাকলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শিফাত বিনতে আরা, রেয়াজউদ্দিন বাজার সমিতির সভাপতি ছালামত আলী, সাধারণ সম্পাদক মো. কালামসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক বিভিন্ন দোকান ও আড়ত ঘুরে পণ্যের মজুত পরিস্থিতি, আমদানি অবস্থা এবং প্রতিদিনের মূল্যতালিকা পর্যবেক্ষণ করেন। বিশেষ করে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ, হলুদ ও জিরাসহ বিভিন্ন মসলার আড়তে গিয়ে তিনি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং ‘উৎসব ছাড়’ কার্যক্রম শুরুর আগে ও পরের মূল্য পরিস্থিতি যাচাই করেন।
জেলা প্রশাসনের সঙ্গে এর আগে একাধিক বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা ঈদ উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান। ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণ মানুষের স্বস্তির কথা বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন পণ্যের দাম কমানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বর্তমান মূল্যের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
বাজার পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, প্রতি বছর উৎসবকে কেন্দ্র করে বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। এই অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে এনে সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতেই জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ।
তিনি বলেন, “উন্নত বিশ্বে উৎসব এলেই পণ্যের দাম কমে। কিন্তু আমাদের দেশে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর মধ্যে অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ সমাজের অসহায়, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য উৎসবের আনন্দ অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা চাই, এমন একটি পরিবেশ তৈরি হোক, যেখানে সব শ্রেণির মানুষ উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারে।”
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক বলেন, খাতুনগঞ্জ ও রেয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ীরা দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছেন। আদা, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ ও গরম মসলাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জিরার দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, “চট্টগ্রাম দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। ব্যবসায়িক যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তনে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরাই প্রথম নেতৃত্ব দেন। আজ তারা সারা দেশের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।”
আদার বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার বিষয়ে জেলা প্রশাসক জানান, বন্দরে আটকে থাকা ৪১টি কনটেইনার খালাসে বিলম্ব হওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছিল। পরে বন্দর কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ইতোমধ্যে ৩৭টি কনটেইনার খালাস করা হয়েছে এবং বাকি কনটেইনারও দ্রুত খালাস করা হবে। এতে আদার দাম আরও কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কালোবাজারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে জেলা প্রশাসক বলেন, “কেউ সিন্ডিকেট করে পার পাবে না। সাধারণ মানুষের আস্থা ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।”
তিনি জানান, ঈদ পর্যন্ত চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ, রেয়াজউদ্দিন বাজারসহ জেলার বিভিন্ন বাজারে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও ভ্রাম্যমাণ টিম অভিযান পরিচালনা করবে। জেলা ও উপজেলার বাজারগুলোতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্থানীয় ক্রেতা ও সাধারণ মানুষ স্বাগত জানিয়েছেন। রেয়াজউদ্দিন বাজার আড়তদার কল্যাণ সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, বাজারে পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে যৌক্তিক লাভে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রিতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পড়ুন: শিশু রামিসার ফরেনসিক রিপোর্টে ধর্ষণের প্রমাণ মিলেছে, শ্বাসরোধে হত্যা
আর/


