নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বাকলজোড়া ইউনিয়নের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে অনন্য অবদান ও দীর্ঘদিনের নিষ্ঠাপূর্ণ সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ ‘সম্মাননা স্মারক’ প্রদান অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে।
শনিবার (৩০ মে) বিকেলে দুর্গাপুরের গুজিকোনা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গুজিকোনা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীবৃন্দের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
অনুষ্ঠানে প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের হাতে সম্মাননা স্মারক ক্রেস্ট তুলে দেওয়ার মাধ্যমে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। সাবেক শিক্ষার্থীদের এমন আয়োজন প্রবীণ শিক্ষকদের যেমন আবেগাপ্লুত করেছে, তেমনি শিক্ষক সমাজ ও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে বলে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সুধীজন আশা ব্যক্ত করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল শুরুতে নিজের পারিবারিক ঐতিহ্য তুলে ধরে বলেন, “আমার ঐতিহ্য, আমার ইতিহাস, আমার ব্যাকবোন হচ্ছেন আমার বাবা; যিনি একজন সাধারণ কৃষক ছিলেন।”
ডেপুটি স্পিকার সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার এবং কলমাকান্দা-দুর্গাপুরের বঞ্চনার ইতিহাস টেনে বলেন, “এলাকায় কিষাণ কলেজ, পশু হাসপাতালসহ ঐতিহ্যবাহী অনেক প্রতিষ্ঠান ছিল, যা কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে। আমরা দেশের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো যতটুকু বেসিক প্রয়োজন, তাও এই জনপদে পাইনি”। তিনি আশ্বাস দেন রাতারাতি সব পরিবর্তন সম্ভব না হলেও পর্যায়ক্রমে এই অঞ্চলে আরও উন্নত মানের স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে।
জনপ্রতিনিধিদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির সংস্কৃতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, “রাজনীতিবিদরা এসে আকাশকুসুম প্রতিশ্রুতি দেয়, আর জনগণ হাততালি দেয়। জনগণ যদি এসে বলে ‘এমপি সাহেব আকাশে চাঁদ লাগবে’, তবে অনেক নেতা বলবে ‘ঐটাও এনে দেব’। আমি প্রথাগত ধারার রাজনৈতিক কর্মী নই। আমি যা করতে পারব, ততটুকুই বলব, আর যা বলব তা বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
তিনি এলাকার ঝড়ে ভেঙে যাওয়া স্কুলের সীমানা প্রাচীর মেরামতের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত এ্যাসিল্যান্ডসহ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের এডিপি ফান্ড থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন।
বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার মাদক ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, “আজ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মাদক এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়ে আমি মা ও বোনেদের বুকফাটা আর্তনাদ শুনেছি, যাদের সন্তান কিংবা স্বামী মাদকের নেশায় পরিবার ধ্বংস করছে।”
মাদক নির্মূলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি কড়া নির্দেশ জারি করেন। তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করছে। আমি রাজনীতি করব, সমাজের নেতৃত্ব দেব, আর মাদক ব্যবসায়ী বা অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেব- তা হতে পারে না। অপরাধীদের যারা শেল্টার দেবে, তাদের বিরুদ্ধেও কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি অপরাধীদের প্রশ্রয় দিয়ে নিজের বিবেকের কাছে দায়ী থাকতে পারব না।”
মাদকাসক্ত যুবকদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে তিনি অতীতে নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ধর্মীয় ও সামাজিক মোটিভেশনের (চিল্লায় পাঠানো) উদাহরণও তুলে ধরেন।
সবশেষে তিনি নাগরিকদের দায়িত্ববোধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। বাড়ির সামনের রাস্তাটি সরকার করে দেওয়ার পর আমরা কয়জন তার পাশে দুটি গাছ লাগাই? রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাজ পুনর্গঠনে এগিয়ে না এলে কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র স্বাবলম্বী হতে পারে না।”
অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, বাকলজোড়া ইউনিয়নের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, গুজিকোনা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং এলাকার সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়।
পড়ুন : রাতে হাসিমুখে সেলফি, গভীর রাতে মৃত্যু: যুবদল নেতার জানাজায় মানুষের ঢল


