বিজ্ঞাপন

দিনাজপুরে নির্যাতনের শিকার নারীদের আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলছে উন্নয়ন সংগঠন “পল্লীশ্রী”

২০২২ সালে সদর উপজেলার রামডুবি সুন্দরপুর ইউনিয়নে তরুন চন্দ্রের সাথে বিয়ে হয় স্বপ্নার (ছদ্মনাম)। বিয়ের সময় স্বপ্নার বাবা মেয়ে জামাইকে ৬ লাখ টাকা যৌতুক প্রদান করে। বিয়ের পর স্বামীর সাথে সুখেই কাটছিল তার সংসার কিন্তু তার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয় বিয়ের এক বছরের মধ্যে, যখন তার স্বামী যৌতুকের জন্য আবারও তাকে চাপ দেয়। দিনমজুর বাবার অপারগতায় স্বপ্নার উপর শুরু হয় নির্যাতন। ২০২৩ সালে তার একটি মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করে। এরপর আরো বেড়ে যায় নির্যাতনের মাত্রা। মারধোরের ফলে হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছে স্বপ্নাকে। বারবার সালিশ, মিমাংসা কিন্তু নির্যাতন কমেনি। লিগ্যাল এইডে মামলা মিমাংসা হলেও অবস্থা একই। অবশেষে ২০২৪ সালে বাবার বাড়িতে চলে আসে স্বপ্না। ৩ বছর ধরে এখন বাবার বাড়িতেই আছে সে। মামলা চলমান, যৌতুকের টাকা ফেরত কিংবা স্ত্রী ও মেয়ের ভরনপোষন কিছুই দিচ্ছে না স্বামী। বর্তমানে স্বপ্না নিজের এবং মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কম্পিউটার গ্র্যাফিক্স প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে।

বিজ্ঞাপন


২০২০ সালে বিয়ে হয় একই উপজেলার রোখসানা খাতুনের (ছদ্মনাম)। এক বছর পর তার মেয়ের জন্ম হয়। একেতো মেয়ে তারপর সদ্য জন্ম নেয়া মেয়ের গায়ের রং শ্যামলা হওয়ায় রোখসানাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। বারবার বিষয়টি মিমাংসা করে স্বামীর বাড়িতে গেলেও চলে শারীরিক নির্যাতন। এক সময় জানতে পারেন স্বামী অন্য মেয়ের সাথে সর্ম্পকে লিপ্ত। ২০২২ সালে তাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে ডিভোর্স লেটার পাঠায় স্বামী। পরে মামলা দায়ের করলে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করলেও কন্যা সন্তানের কোন খোজ নেয়না এবং ভরনপোষন দেয় না। বর্তমানে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়িতেই অন্যের কাপড় সেলাই করে নিজের ও মেয়ের খরচ চালান তিনি।


শুধু এই দুটি ঘটনাই নয়, প্রতিনিয়তই যৌতুক কিংবা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে নারীদেরকে। সালিশ, এমনকি মামলা করলেও সহসাই পাচ্ছেন না এসবের প্রতিকার। এখন নিজের পাশাপাশি সন্তানের ভরনপোষণ, সংসার নির্বাহ করাটাও কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে । মামলা পরিচালনা করার পাশাপাশি নিজেদেরকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলাটা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দিনাজপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ও বেসরকারী সংগঠন পল্লীশ্রীর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ২ জনেরও বেশি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে দিনাজপুরে। অথচ এই জেলাতেই নারী নির্যাতন ও হত্যাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বৃহৎ আন্দোলন, ইয়াসমিন ট্রাজেডী। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে দূর্বলতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারনে নির্যাতনের প্রবণতা বাড়ছে।
তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৫ সালে এই জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের হয় ৮১৪টি। যা প্রতিদিন গড়ে ২ জনের বেশি। ২০২৪ সালেও নির্যাতনের সংখ্যা ছিল ১০৮৯টি এবং ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ১৩৬৩টি।


নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও নারীর ক্ষমতায়নকে ফোকাস করে গড়ে ওঠা সংগঠন পল্লীশ্রী গত ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত মোট ৮৪৭ জন নির্যাতনের শিকার নারীদেরকে নিয়ে কাজ করেছে। তাদের মধ্যে ৭৩৫টি অভিযোগ সালিশের মাধ্যমে সমাধান হয়েছে। শুধু সমাধানই নয়, নির্যাতনের শিকার নারীদেরকে স্বাবলম্বী করতে তাদেরকে দক্ষ ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছে সংগঠনটি। নির্যাতিত নারীদেরকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হচ্ছে। সেখানে তারা কম্পিউটার, সেলাই, বুটিকস, ব্যাগ তৈরী, সুতা দিয়ে কাপড় তৈরী, ক্ষুদ্র ব্যবসার আইডিয়া এমন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হলে তাদেরকে সক্ষমতা অনুযায়ী প্রারম্ভিক পুজি বা অর্থ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। যাতে করে তারা নিজের পায়ে দাড়াতে পারে।


পল্লীশ্রীর কর্মকর্তারা বলছেন, নির্যাতনের অভিযোগ সমাধানের পাশাপাশি প্রয়োজন নারীদের সম্মান ও ন্যায্যতা পাওয়ার ব্যবস্থা ও সংসার নির্বাহ এবং তাদের সন্তানদের ভরনপোষনের জন্য তাদেরকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলা। প্রান্তিক নারীদের অধিকার রক্ষা, তাদের অধিকার আদায়ের জন্য সুশীল সমাজের সংগঠন এবং সরকারী কর্তৃপক্ষকে সাথে নিয়ে কাজ করে আসছে পল্লীশ্রী।


আর এসব নিযতনের শিকার নারীদেরকে স্বাবলম্বী করে তোলাটা অনেক চ্যালেঞ্জিং তথাপিও গত এক বছরে পল্লীশ্রী ৯৭ জন নিযাতনের শিকার নারীর সাথে কাজ করেছে। তাদের মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার ৩৩ জন, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার ১৫ জন, শারীরিক নির্যাতনের শিকার ২৯ জন। এছাড়াও জমিজমা সংক্রান্ত, মানসিক নির্যাতন, বাড়ি থেকে বের করে দেয়া, যৌন হয়রানী, পরকীয়ায় নির্যাতনসহ বিভিন্ন ভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আরও ২০ জন নারী। গত এক বছরে ১১৫ জন নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছে পল্লীশ্রী। তাদের মধ্যে ৪৭ জন সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে দর্জি হয়েছেন, ৩ জন কসমেটিকসের দোকান দিয়েছেন, ৫ জন ফেরী ব্যবসা করছেন, ১৫ জন ব্যাগ তৈরী করছেন, অনলাইনে কাপড়ের ব্যবসা করছেন ৪ জন, দুধের ব্যবসা করছেন ৪ জন, হোটেল ও চায়ের দোকান ১৪ জন, করুস কাটা (সুতা দিয়ে কাপড় তৈরী) ৩ জন, পিঠার দোকান একজন এবং মুদির দোকান করছেন ২০ জন নারী।


নারী নির্যাতন প্রতিরোধে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতায় সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক শামীম আরা বেগম জানান, বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে দূর্বলতার কারনে নির্যাতনের প্রবণতা বাড়ছে। এজন্য দ্রুত বিচার আইনের মাধ্যমে এসব মামলা পরিচালনা ও অপরাধী যেই হোক তাকে দ্রুত বিচার আইনের মাধ্যমে তার শাস্তি কার্যকর করতে হবে। নারীরা পরনির্ভরশীল না হলে নির্যাতনের মাত্রা এমনিতেই কমে আসবে। এজন্য আমরা কাজ করছি এসব নারীরা যাতে স্বাবলম্বী হতে পারে। সে জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান ও প্রশিক্ষন পরবর্তী সংগঠনের স্বক্ষমতা অনুযায়ী প্রারম্ভিক পুজি প্রদানসহ তাদেরকে দক্ষ করে গড়ে তোলা। যাতে করে তারা নিজের পায়ে দাড়াতে পারে এবং বিভিন্ন সরকারী বা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে তাদেরকে সম্পৃক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেকেই নিজেদেরকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

পড়ুন- বিদ্যুতের দাম: গ্রাহক ও পাইকারি পর্যায়ে কত বাড়ল?

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন