নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের মহাদেও নদে আদালতের সুস্পষ্ট স্থগিতাদেশ ও সরকারি নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। প্রতিদিন শতাধিক ইঞ্জিনচালিত নৌকার মাধ্যমে নদী থেকে দেদারসে বালু ও পাথর তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এতে একদিকে যেমন নদীভাঙন ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করলেও কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না।
জানা যায়, পরিবেশ ও স্থানীয় জনবসতির কথা বিবেচনায় নিয়ে সম্প্রতি মহাদেও নদীর ‘ওমরাগাঁও, হাসনায়াগাঁও ও বিশাউতি’ বালুমহালের ইজারা কার্যক্রমের ওপর হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দেন। বালুখেকো চক্র আদালতের নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে তাদের অবৈধ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সন্ধ্যায় সরেজমিনে মহাদেও নদীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীতে ছোট-বড় অসংখ্য ইঞ্জিনচালিত নৌকা অবাধে চলাচল করছে। এসব নৌকায় প্রকাশ্যে বালু ও পাথর লোড করে পরিবহন করা হচ্ছে।
নদীতীরবর্তী ব্যস্তপুর গ্রামের বাসিন্দা জলিল মিয়া, নুর মোহাম্মদ ও সাব্বিরসহ কয়েকজন জানান, ঈদের আগ থেকেই প্রতিদিন প্রায় শতাধিক নৌকা নদীতে চলাচল করছে। নদীর পাড় ঘেঁষে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে। রাতভর ইঞ্জিনের বিকট শব্দে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বাসিন্দা বলেন, রাতে অনেক সময় নদীর পাড়ে নৌকা ভিড়িয়ে শ্রমিকরা অবস্থান করেন। কেউ প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে পড়তে হয়। ফলে সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ অবৈধ বালু ব্যবসার সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগসূত্র থাকতে পারে। তাদের প্রশ্ন, প্রশাসনের নজরদারি থাকার পরও কীভাবে প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণ বালু পরিবহন হচ্ছে?
এর আগে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে এবং ২০২৩ সালের সংশোধিত বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের সুপারিশে ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ এক অফিস আদেশে মহাদেও নদীর ৬ নম্বর বালুমহাল বন্ধ ঘোষণা করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম বলেন, “মহাদেও নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমরা শুনেছি। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আদালতের নির্দেশনা ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হবে না।”
কলমাকান্দা থানার ওসি (তদন্ত) সজল সরকার বলেন, “আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মহাদেও নদী শুধু একটি নদী নয়, এটি সীমান্তবর্তী অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই আদালতের নির্দেশনা ও সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। অন্যথায় অব্যাহত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, কৃষিজমি, বসতভিটা ও পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
পড়ুন : পুশ ইন ঠেকাতে বিজিবির পাশাপাশি জনগণের সহযোগিতা চান ইউএনও


