উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর তীব্র স্রোতে সিরাজগঞ্জের চৌহালী, কাজিপুর, শাহজাদপুর ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ নদীতীরবর্তী জনপদে শুরু হয়েছে নদীভাঙন। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও মানুষের জীবনভর গড়া স্বপ্ন। আর প্রতিটি ভাঙনের সাথে বাড়ছে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর দীর্ঘশ্বাস।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চৌহালীর চর সলিমাবাদ গ্রামের অটোরিকশাচালক মোল্লা সাইফুল ইসলামের নিকট গত কয়েকদিন ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। কিন্তু ভূমিহীন এই মানুষের একমাত্র সম্বল ছিল একটি ছোট্ট বসতঘর। গত (৫ জুন) রাতেই সেই আশ্রয়টুকুও যমুনার ভয়াল ভাঙনে কেড়ে নিয়েছে।
সাইফুলের মতো গত তিন সপ্তাহে চৌহালী উপজেলার অন্তত ৬ থেকে ৭টি গ্রামের বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অসংখ্য বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও গাছপালা। এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে শত শত পরিবার।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, খাস কাউলিয়া ইউনিয়নের ভূতের মোড়, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিনানুই, রেহাই পুখুরিয়া, দেওয়ানগঞ্জ বাজার, চর সলিমাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন চলছে। কোথাও কোথাও কয়েকশ ফুট এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে।
চর সলিমাবাদ এলাকার ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম জানান, মাত্র দুই সপ্তাহে তার এলাকায় ৩০টিরও বেশি বাড়ি-ঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন পরিবার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় রাত কাটাচ্ছে।
চরকানালিয়া গ্রামের আব্দুল গফুরের কণ্ঠে ফুটে ওঠে নদীভাঙনের দীর্ঘ ইতিহাস। একসময় বাপ-দাদার প্রায় ৫০ বিঘা জমির মালিক ছিলেন তিনি। কিন্তু যমুনার ধারাবাহিক ভাঙনে সব হারিয়ে এখন হাতে রয়েছে মাত্র কয়েক শতাংশ জমি।
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আবেগঘন কণ্ঠে মানিক বলেন, বারবার ঘর করেছি, বারবার নদী নিয়ে গেছে। আমরা আর কিছু চাই না, শুধু একটা স্থায়ী বেড়িবাঁধ চাই। একটা স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।
চর সলিমাবাদের গৃহবধূ শাহিনুরের কণ্ঠেও একই আকুতি। তিনি বলেন, আমরা কাজ করে খেতে পারি, কিন্তু নদীর ভাঙন থামাতে পারি না। একটা স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত সন্তানদের নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।
৬০ বছর বয়সী করিমন বেগম কয়েক বছর আগেই হারিয়েছেন নিজের বসতভিটা। নদীর ভাঙন তার জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে নিরাপত্তা ও শান্তি। তিনি বলেন, আমাদের গ্রাম, বাড়িঘর, জমিজমা সব নদী গিলে খাচ্ছে। ভাঙনের চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের সম্ভুদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় সম্প্রতি প্রায় ৩০০ মিটার ভূমি একসঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে খাসপুখুরিয়া ও বাঘুটিয়া ইউনিয়নের শত শত পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও কৃষিজমি এখন হুমকির মুখে।
শুধু চৌহালী নয়, কাজিপুর উপজেলার খাস রাজবাড়ী, নাটুয়ারপাড়া, সদর উপজেলার কাওয়াকোলা চর এবং শাহজাদপুরের গালা ও সনাতনী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
নাটুয়ারপাড়ার কৃষক কালাম শেখ, আব্দুল কাদের ও সামছুল শেখ বলেন, যমুনার পানি বাড়া-কমার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুশ্চিন্তাও বাড়ছে। বছরের পর বছর ফসলি জমি, বসতভিটা ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। স্থায়ী কোনো সমাধান না থাকায় দুর্ভোগ কমছে না।
কাওয়াকোলা চরের কৃষক রবিউল হাসান বলেন, সারাবছর কষ্ট করে চাষাবাদ করি, কিন্তু নদী এক মুহূর্তে সবকিছু কেড়ে নেয়। এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা, পরিবার নিয়ে আগামী দিনে কোথায় আশ্রয় নেবো।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মে মাসের মাঝামাঝি থেকে যমুনার পানি দ্রুত বাড়লেও এখনো তা বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে পানি ওঠানামার কারণে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। তবে চরাঞ্চলের ভেতরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কোনো সরকারি পরিকল্পনা নেই।
পড়ুন:টানা ১০ ঘণ্টা যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ থাকবে না
দেখুন:জমি বিক্রি করে ৭.৫ কি. মি. জার্মান পতাকা বানালেন আমজাদ!
ইমি/


