ফুটবল বিশ্বে এমন কিছু নাম আছে, যাদের পরিচয় দিতে বিশেষণের প্রয়োজন হয় না। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি সেই বিরল কয়েকজনের একজন। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহর থেকে উঠে এসে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো এই তারকা আজ কোটি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার নাম। বর্তমানে মেজর লিগ সকারের ক্লাব ইন্টার মায়ামি এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন তিনি। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃত মেসি তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গড়েছেন অসংখ্য রেকর্ড, জিতেছেন অগণিত শিরোপা ও ব্যক্তিগত পুরস্কার।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দোলির হয়ে ফুটবলে হাতেখড়ি হয় মেসির। পরে তিনি যোগ দেন নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজে। তবে ১১ বছর বয়সে তার গ্রোথ হরমোনের সমস্যা ধরা পড়ে, যা তার ফুটবল ক্যারিয়ারকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে না পারলেও তার অসাধারণ প্রতিভা নজর কাড়ে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার। ক্লাবটি চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় এবং মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেসি স্পেনে পাড়ি জমান।
লা মাসিয়া থেকে বিশ্বমঞ্চে
বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি ‘লা মাসিয়া’তে নিজেকে দ্রুত প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। ২০০৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক হয় তার। শুরুতে ইনজুরির সঙ্গে লড়াই করতে হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।
বার্সেলোনার সোনালি যুগের নায়ক
বার্সেলোনার জার্সিতে মেসির উত্থান ছিল রূপকথার মতো। প্রায় দুই দশক ধরে ক্লাবটির হয়ে তিনি জিতেছেন ১০টি লা লিগা, ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ, ৬টি কোপা দেল রে-সহ মোট ৩৩টি বড় শিরোপা। ক্লাবটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেও নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখেছেন তিনি।
রেকর্ডের পর রেকর্ড
ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও মেসি এক অনন্য উচ্চতায় অবস্থান করছেন। তিনি ফুটবল ইতিহাসে সর্বাধিক আটবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। এছাড়া ছয়টি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট, অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং শত শত রেকর্ড তার দখলে। লা লিগায় ৪৪০ গোল, এক মৌসুমে ৫০ গোল, এক বছরে ৯১ গোল এবং এল ক্লাসিকোতে ২৬ গোল—সবই তার অসাধারণত্বের প্রমাণ।
জাতীয় দলের আক্ষেপ থেকে বিশ্বজয়
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়েও মেসির অবদান অনন্য। তবে জাতীয় দলের হয়ে বড় শিরোপা জয়ের জন্য তাকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০১৪ বিশ্বকাপ ও পরপর দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারার পর ২০১৬ সালে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরে ফিরে এসে বদলে দেন সবকিছু।
কোপা আমেরিকা থেকে বিশ্বকাপ
২০২১ সালে তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা জিতে নেয় কোপা আমেরিকা। এরপর ২০২২ সালে ফাইনালিসিমা এবং কাতার বিশ্বকাপ জয় করে পূর্ণতা পায় তার ক্যারিয়ার। বিশ্বকাপে সাত গোল করে জেতেন গোল্ডেন বল। ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফি হাতে তুলে নিয়ে পূরণ করেন শৈশবের স্বপ্ন।
বার্সেলোনা অধ্যায়ের সমাপ্তি
২০২১ সালে আর্থিক ও কাঠামোগত জটিলতার কারণে বার্সেলোনার সঙ্গে ২১ বছরের সম্পর্কের অবসান ঘটে। সেই বিদায়ের দৃশ্য আবেগাপ্লুত করেছিল গোটা ফুটবল বিশ্বকে। পরবর্তীতে তিনি পিএসজি হয়ে ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন এবং এখনও মাঠে নিজের জাদু ছড়িয়ে যাচ্ছেন।
মাঠের বাইরের মেসি
দীর্ঘদিনের সঙ্গী আন্তোনেলা রোকুজ্জোকে ২০১৭ সালে বিয়ে করেন মেসি। তাদের তিন সন্তান রয়েছে। পরিবারকেন্দ্রিক জীবন, বিনয়ী আচরণ এবং বিতর্কমুক্ত ব্যক্তিত্ব তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
কেন মেসি সর্বকালের সেরা?
দ্রুত গতি, অসাধারণ ড্রিবলিং, নিখুঁত পাসিং, গোল করার অদ্ভুত ক্ষমতা এবং ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য—সবকিছু মিলিয়ে মেসি এক অনন্য ফুটবলার। সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলার ভাষায়, “মেসি এমন একজন খেলোয়াড়, যে বল ছাড়া যত দ্রুত দৌড়াতে পারে, বল নিয়ে তার চেয়েও দ্রুত দৌড়াতে পারে।”
ফুটবলের জাদুকর এখনও মাঠে
ক্যারিয়ারের দুই দশকের বেশি সময় পার করেও মেসির প্রভাব কমেনি। বয়সকে পেছনে ফেলে তিনি এখনও মাঠে নিজের জাদু ছড়িয়ে যাচ্ছেন। তাই ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মেসি কেবল অতীতের কোনো কিংবদন্তি নন, তিনি বর্তমানেরও এক জীবন্ত ইতিহাস।


