গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় জাতীয় ফল কাঁঠাল এখন কৃষকের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে।
উপজেলার ফুলবাড়িয়া, হাটুরিয়াচালা, বরইবাড়ি, গোসাইবাড়ি, মৌচাক ও চান্দুরা এলাকাজুড়ে কাঁঠালের বাম্পার ফলন হয়েছে। রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ কাঁঠাল গাছ আর বাগানজুড়ে ঝুলছে শত শত কাঁঠাল। মৌসুমজুড়ে এসব এলাকার কাঁঠাল ট্রাকভর্তি হয়ে ঢাকা, উত্তরবঙ্গ, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক কৃষক ধান, পাট ও অন্যান্য মৌসুমি ফসলের পরিবর্তে কাঁঠাল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তুলনামূলক কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় কাঁঠাল এখন তাদের আয়ের অন্যতম ভরসা। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, মাত্র ১০টি পরিপক্ব কাঁঠাল গাছ থেকেই বছরে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।
স্থানীয় কৃষক লাবু মিয়া বলেন, আগে জমিতে ধান চাষ করে তেমন লাভ হতো না। এখন কাঁঠাল গাছ থেকে নিয়মিত আয় হচ্ছে। প্রতি মৌসুমে গাছভেদে ১০০ থেকে ১৫০টি কাঁঠাল পাওয়া যায়। কাঁঠাল বিক্রির টাকা দিয়ে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনও মেটাতে পারছি।
আরেক কৃষক ইউনুছ আলী বলেন, আমার মাত্র কয়েক শতাংশ জমিতে কয়েকটি কাঁঠাল গাছ রয়েছে। এসব গাছের ফল বিক্রি করেই ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাই। কাঁঠাল এখন আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু ফল নয়, কাঁঠালের বিচিও এখন বাড়তি আয়ের উৎস। স্থানীয় বাজারে কাঁঠালের বিচি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বিচি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের তরকারি, ভর্তা ও খিচুড়ি রান্নার পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পেও এর ব্যবহার বাড়ছে।
স্থানীয় কাঁঠাল ব্যবসায়ী আলাল বলেন, কালিয়াকৈরের কাঁঠালের স্বাদ ও গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে সরাসরি বাগান থেকে কাঁঠাল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিবছর চাহিদা বাড়ছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উন্নত জাতের বারি কাঁঠাল-২সহ বিভিন্ন জাতের কাঁঠালের আবাদ বাড়ছে। কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানিরও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদ হাসান বলেন, কালিয়াকৈরে কাঁঠাল চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কাঁঠালের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ আরও উন্নত করা গেলে কৃষকের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
তবে কৃষকদের দাবি, এলাকায় কাঁঠাল সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হলে অপচয় কমবে, তারা ন্যায্য মূল্য পাবেন।
স্থানীয় কৃষক আবুল হোসেন বলেন, সরকারিভাবে কোল্ড স্টোরেজ ও প্রসেসিং সুবিধা দেওয়া হলে আমরা আরও বেশি কাঁঠাল উৎপাদন করতে পারব। এতে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, কাঁঠালের ফল, বিচি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কালিয়াকৈরের হাজারো কৃষকের জীবনমান উন্নত হবে। একই সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এ খাত। বর্তমানে কাঁঠাল শুধু একটি ফল নয়, কালিয়াকৈরের অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের জন্য ‘সোনার ফল’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।


