বিজ্ঞাপন

পৈতৃক ভিটায় পরবাসী: আইনের বেড়াজালে জিম্মি হাজারো মানুষের অধিকার

বাঙালি জাতির ইতিহাসে ভূমি অধিগ্রহণ মানেই সাধারণ মানুষের ভিটেমাটি চ্যুত হওয়া, উদ্বাস্তু হওয়া এবং চিরতরে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার এক নির্মম উপাখ্যান। যখনই যেখানে উন্নয়ন বা অন্য কোনো প্রকল্পের অজুহাতে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, সেখানেই মানুষ তার পূর্বপুরুষের স্মৃতি, উপার্জনের ঔঔউৎস এবং মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে পথে বসেছে।

​এই নির্মম বাস্তবতার এক জলজ্যান্ত ও দীর্ঘস্থায়ী উদাহরণ রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন জোয়ার সাহারা মৌজার নিকুঞ্জ-২ সংলগ্ন টানপাড়া এলাকা। এই অঞ্চলের মানুষ একবার নয়, একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে ভূমি হারিয়ে স্থানচ্যুত হয়েছেন। আজ পাকিস্তান আমলের সেই পুরনো ক্ষতের ওপর নতুন করে চেপে বসেছে আধুনিক আমলাতন্ত্র ও দুর্নীতির এক অদৃশ্য পাহাড়।

ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি ও বারবার স্থানচ্যুতির ক্ষত

​টানপাড়ার এই ভূমি জটিলতার কালো মেঘের সূত্রপাত তৎকালীন পাকিস্তান আমলে। ১৯৬১-৬২ সালে ভূমি অধিগ্রহণ মামলা নম্বর ১৩৮/৬১-৬২ এর আওতায় জোয়ার সাহারা মৌজার বিস্তীর্ণ এলাকা তৎকালীন ‘ডিআইটি’ (বর্তমান রাজউক) ও অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন সময়ে কোনো ধরনের জনমত বা মানবিক দিক বিবেচনা না করেই হাজার হাজার মানুষকে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়।

​তবে এক অদ্ভুত প্রশাসনিক অসংগতির কারণে, সংশ্লিষ্ট এলাকার বহু জমির বাস্তব দখল সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা কোনোদিন গ্রহণ করেনি। অনেক আদি মালিক কোনোদিন ক্ষতিপূরণের একটি টাকাও চোখে দেখেননি। ফলে, উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলোর একাংশ নিরুপায় হয়ে পৈতৃক ভূমির মায়া ছাড়তে না পেরে বংশপরম্পরায় ওই জমিতেই বসবাস করতে থাকেন। কাঁচা ঘর থেকে কালক্রমে মাথা গোঁজার জন্য পাকা ও আধা-পাকা স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করেন।
​স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশক ধরে টানপাড়ার মানুষ আইনি লড়াই, প্রশাসনিক কার্যালয়ে দৌড়ঝাঁপ এবং নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যান। শত শত পরিবারের এই লড়াই ছিল টিকে থাকার লড়াই, নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের লড়াই। এই দীর্ঘ সময়ে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্তাদের অনীহা, নথিপত্রের হারিয়ে যাওয়া এবং নানা আমলাতান্ত্রিক অজুহাতে টানপাড়ার সাধারণ নাগরিকদের বারবার নিগৃহীত হতে হয়েছে। এক প্রজন্ম পৈতৃক ভিটের অধিকার আদায়ের লড়াই করতে করতে কবরে চলে গেছেন, বর্তমানে অন্য প্রজন্ম সেই একই লড়াইয়ের হাল ধরেছেন।

​অবশেষে, ২০১৭ সালের ২২ জুন তাঁদের জীবনে আনন্দের জোয়ার এসেছিল। ভূমি মন্ত্রণালয় এক ঐতিহাসিক সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে ১৩৮৫ দশমিক ২৮ একর ভূমি মূল মালিকদের অনুকূলে অবমুক্ত ঘোষণা করে। সরকারি শর্ত অনুসারে, ভূমি মালিকরা তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ নির্ধারিত চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেন।

​এরপর ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অধিগ্রহণ শাখা থেকে প্রতিটি জমির বিপরীতে আলাদা আলাদা ‘অনাপত্তি সনদ’ সংগ্রহ করেন। এখানেই শেষ নয়; সরকারের সর্বশেষ ভূমি রেকর্ড তথা ঢাকা মহানগর জরিপে এই জমিগুলো সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষে সংশ্লিষ্ট মালিকদের নামে চূড়ান্তভাবে খতিয়ানভুক্ত ও রেকর্ডভুক্ত হয়।

​বৈধ কাগজের পিঠে অদৃশ্য নিষেধাজ্ঞার দেওয়াল

​আইনানুযায়ী, মহানগর জরিপ চূড়ান্ত হওয়ার পর একজন নাগরিকের নামজারি এবং খাজনা দেওয়া তাঁর মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু টানপাড়ার মানুষের ভাগ্যে ঘটল উল্টোটা। সব বৈধ কাগজ থাকার পরও হঠাৎ করেই খিলক্ষেত সার্কেলের ভূমি কার্যালয় থেকে টানপাড়ার জমির ই-নামজারি ও খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারি কার্যালয়ে গেলে এক লাইনের মুখস্থ উত্তর দেওয়া হয়—”ওপরের নির্দেশ আছে, টানপাড়ার জমির নথি স্থগিত রাখা হয়েছে।”

​কিন্তু এই তীব্র সংকটের অন্ধকার গলির ভেতরেই চলছে অন্য এক সমান্তরাল বাস্তবতা। সাধারণ মানুষের জন্য নিয়মের দরজা যেখানে পুরোপুরি বন্ধ, সেখানে ‘বিশেষ প্রক্রিয়ায়’ ও বিপুল অর্থের বিনিময়ে কিছু জমি ঠিকই রেজিস্ট্রি হচ্ছে, মালিকানা হস্তান্তর হচ্ছে এবং নথিও টেবিল থেকে টেবিলে নির্বিঘ্নে অগ্রসর হচ্ছে।

​টানপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি কোটি টাকার প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ঘুরপাক খাচ্ছে—”যদি সরকারি নিষেধাজ্ঞা বা আইনি জটিলতার কারণেই সব সেবা বন্ধ থাকে, তবে কিছু মানুষের কাজ কীভাবে হচ্ছে?”

​আইনে যদি বাধা থাকে, তবে অতিরিক্ত লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিলে সেই আইন বা নিষেধাজ্ঞা কোথায় উবে যায়? পর্দার আড়ালে নির্দিষ্ট কিছু দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের চুক্তি করলে অসম্ভব কাজও জাদুকরীভাবে সম্ভব হয়ে যাচ্ছে।

​এতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, সমস্যা আসলে আইনে বা কাগজপত্রে নয়; সমস্যা তৈরি করে রাখা হয়েছে কৃত্রিমভাবে, যেন দুর্নীতির বাজার সবসময় গরম থাকে এবং সাধারণ মানুষের পকেট কেটে একটি গোষ্ঠী আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে পারে। প্রশাসনিক এই কৃত্রিম অচলাবস্থা আসলে কোনো আইনি সংকট নয়, বরং এটি পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা একটি মুনাফা শিকারের ফাঁদ।

​ভুক্তভোগীদের বুকফাটা আর্তনাদ ও মাঠপর্যায়ের রূঢ় বাস্তবতা

​একটি জমির মালিকানা যখন প্রশাসনিক মারপ্যাঁচে আটকে থাকে, তখন সেটি শুধু কিছু কাগজের টুকরোর সংকট থাকে না; তা রূপ নেয় এক গভীর মানবিক ও সামাজিক সংকটে। টানপাড়ার হাজারো পরিবার আজ বহুমুখী নাগরিক অধিকার বঞ্চনার শিকার। এই বঞ্চনা কতটা গভীর, তা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা না বললে অনুধাবন করা অসম্ভব।

​এলাকার বাসিন্দা মতিউর রহমান স্বপন যেমন তাঁর বুকফাটা আকুতি প্রকাশ করে বলছিলেন: ​”বাপ-দাদার আমল থেকে এই মাটিতে আমাদের বাস। পাকিস্তান আমলে একবার উচ্ছেদ হইলাম, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভাবছিলাম নিজের জমিতে শান্তিতে ঘুমামু। সরকারের সব নিয়ম মাইনা, কষ্টার্জিত টাকা কোষাগারে জমা দিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে অনাপত্তি সনদ তুললাম, সিটি জরিপেও আমাদের নাম চূড়ান্ত হইলো। অথচ আজ বছরের পর বছর ধইরা নিজের পৈতৃক ভিটার খাজনা দিতে পারতাছি না, নামজারি হইতাছে না। পোলাপানের উচ্চশিক্ষার জন্য একটা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিমু, তারও উপায় নাই। আমাদের সব কাগজ তো বৈধ, তাইলে এই কোন অদৃশ্য দেওয়াল আমাদের আমাগো নিজের জমিতেই পরবাসী বানায়া রাখছে? আমরা কি এই দেশের নাগরিক না? আমাদের এই মৌলিক অধিকার কাইড়া নেওয়ার অধিকার কে দিল?”

​অনুরূপ অসহায়ত্ব ও ক্ষোভের সুর পাওয়া গেল এলাকার আরেক বাসিন্দা মুকুল হোসেন মৃধার কণ্ঠে। খিলক্ষেত ভূমি কার্যালয়ের টেবিলে টেবিলে ঘুরে ক্লান্ত এই মানুষটি বিষণ্ণ কণ্ঠে বলেন: ​”সরকারি কার্যালয়ে গেলে এক কথা—আইনি জটিলতা আছে, ফাইল বন্ধ। কিন্তু আমার চোখের সামনেই এলাকার কিছু প্রভাবশালী মানুষ আর দালাল চক্রের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা ঢাললে অসম্ভব কাজও কেমনে জানি সম্ভব হইয়া যায়! কিছুদিন পর পর দেহি একই দাগের অন্য মানুষের নামজারি হয়ে গেছে, জমির মালিকানা বদল হয়ে গেছে। তখন বুকটা ফাইটা যায়। সমস্যা তাইলে আইনে না, সমস্যা হইলো টেবিলে আর টাকার খেলায়। টাকার অভাবে পরিবারের মানুষের চিকিৎসার খরচ জোগাইতে পারতাছি না, নিজের জমি থাইকাও আজ আমরা পথের ফকিরের মতো অসহায় দিন পার করতাছি। এই জুলুম দেখার কি কেউ নাই? সরকার কি এই অন্ধ চক্রের খোঁজ রাখে না?”

​এই কৃত্রিম সংকটের কারণে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো টানপাড়া অঞ্চলের স্বাভাবিক জনজীবন ও অর্থনৈতিক চাকা। ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি বণ্টন কিংবা ঘরবাড়ি মেরামতের মৌলিক অধিকারটুকুও আজ আমলাতন্ত্রের যাতাকলে পিষ্ট।

​ভুক্তভোগী এ এম আইয়ুব পাপ্পু তাঁর তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন: ​”দেশের কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান নামজারি খতিয়ান আর হালনাগাদ খাজনার দাখিলা ছাড়া ঋণ দেয় না। ব্যবসাটা একটু বড় করমু, বা এই জমিতে রাজউকের নিয়মকানুন মাইনা একটা বৈধ ভবন তুলমু—তার কোনো পথই খোলা নাই। ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া জমির কাগজপত্র ভাইবোন ও ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন বা নিজের নামে নামজারি করতে পারতাছি না। এইটা শুধু প্রশাসনিক জটিলতা না, এইটা আমাগো ওপর এক ধরনের মানসিক নির্যাতন। স্বাধীন দেশে সব কাগজ বৈধ থাকার পরও কেন আমাগো নিজের অধিকারের জন্য চোরের মতো দিন কাটাতে হইবো? আমাদের অপরাধটা কী? আমরা তো কর ফাঁকি দিতে চাই না, খাজনা দিতে চাই। কিন্তু রাষ্ট্র আমাদের থেকে সেই কর কেন নিচ্ছে না?”

​রাজউকের বেড়িডোর ও সুশাসনের অভাব

​টানপাড়ার বাসিন্দাদের এই দুর্ভোগ কেবল ভূমি কার্যালয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের জটিলতাও। ঢাকা শহরের নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো নতুন ভবন নির্মাণ বা সংস্কার করতে গেলে রাজউকের ‘ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র’ ও ‘নকশা অনুমোদন’ বাধ্যতামূলক। আর এই অনুমোদনের জন্য প্রধান শর্তই হলো হালনাগাদ খাজনার রসিদ ও নামজারি খতিয়ান।

​যেহেতু ভূমি কার্যালয় এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, তাই রাজউক থেকেও কোনো ভবনের অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে, বৈধভাবে ঘর তোলার সব পথ বন্ধ। এই কারণে বহুতল ভবন তো দূরের কথা, কোনো জরাজীর্ণ পৈতৃক বাসস্থান ভেঙে নতুন করে দুটি ঘর তোলার মতন স্বাভাবিক সুযোগও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

​অথচ স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অনুমোদনের ক্ষেত্রেও অসাধু চক্র সক্রিয়। যারা লাখ লাখ টাকা খরচ করতে রাজী, অবৈধ পথে তাদের বহুতল ভবন ঠিকই উঠে যাচ্ছে। আর যারা সৎ উপায়ে নিয়ম মেনে চলতে চান, তারা বছরের পর বছর ধরে টিনের চালার নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই বৈপরীত্য পুরো এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ বিনষ্ট করছে।

​টানপাড়ার মানুষ রাষ্ট্রের কাছে কোনো দয়া বা অনুগ্রহ ভিক্ষা চাচ্ছে না। তারা শুধু রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত এবং দেশের প্রচলিত আইনে তাদের যে অধিকার, সেটির বাস্তব বাস্তবায়ন দেখতে চায়। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে ভূমি মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করল, সরকারের সর্বোচ্চ জেলা প্রশাসন অনাপত্তি সনদ দিল, সরকারেরই জরিপ অধিদপ্তর মহানগর জরিপে চূড়ান্ত রেকর্ড দিল—সবুজ সংকেতের আর কী বাকি আছে? এরপরও যদি মাঠ পর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা সাধারণ মানুষকে নামজারি করতে না দেয়, খাজনা না নেয়, তবে বুঝতে হবে সুশাসনের ভেতরেই একদল লোক সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফায়দা লুটছে।

আইনি মারপ্যাঁচে যখন জিম্মি সংবিধানের মৌলিক ধারা

​আমাদের সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর এবং অন্য কোনোভাবে তা নিষ্পত্তি করার অধিকার থাকবে। কিন্তু খিলক্ষেত ভূমি কার্যালয় যেন সংবিধানের এই মৌলিক ধারাকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। টানপাড়ার বাসিন্দারা তাঁদের বৈধ অর্জের বা পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি না পারছেন হস্তান্তর করতে, না পারছেন ব্যবহার করতে। সম্পত্তির এই অধিকার হরণ করার অর্থ হলো একজন মানুষের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া।

​ভূমি প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মুখে ‘আধুনিক বাংলাদেশ’ ও ‘উন্নত ভূমি সেবা’র বুলি আওড়ালেও মাঠ পর্যায়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়গুলোতে নামজারির নামে সাধারণ মানুষকে মাসের পর মাস ঘোরানো হচ্ছে। নথির গায়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি ত্রুটি দেখাতে না পেরে শুধু ‘স্থগিত’ বা ‘নথিভুক্ত নয়’ লিখে রাখা হয়েছে। এই আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা ও স্বচ্ছতার অভাব সরাসরি নাগরিক হয়রানির শামিল এবং দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী।

​ডিজিটাল সেবার নামে শুধু ইন্টারনেট ভিত্তিক আবেদন গ্রহণ করা হলেও, ভেতরে ভেতরে ফাইলের চাকা সচল করতে সেই সনাতন টেবিল বাণিজ্যের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ ডিজিটাল প্রযুক্তির সুফল পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো প্রতারণার নতুন নতুন ফাঁদে আটকা পড়ছেন।

বৈষম্যের অবসান ও একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

​একই মৌজায়, একই দাগের জমির ক্ষেত্রে দুই ধরনের আইন দেখা যাচ্ছে। একজন সাধারণ সৎ নাগরিককে বলা হচ্ছে আইনগত জটিলতার কারণে কাজ হবে না, অথচ তার পাশের প্লটের লোক প্রভাব খাটিয়ে বা লাখ লাখ টাকা লেনদেন করে কাজ ঠিকই নামিয়ে নিচ্ছে। এই বৈষম্য প্রগতিশীল ও সমতার বাংলাদেশের চেতনার পরিপন্থী।

​হাজারো মানুষের এই দীর্ঘদিনের কান্না এবং মতিউর রহমান স্বপন, মুকুল হোসেন মৃধা কিংবা এ এম আইয়ুব পাপ্পুর মতো অসংখ্য ভুক্তভোগীর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি। এই তদন্তের আওতায় খিলক্ষেত ভূমি সার্কেলের বিগত কয়েক বছরের সকল নামজারি এবং রাজউকের দেওয়া সকল অনুমোদনের নথিপত্র পুনঃনিরীক্ষণ করা দরকার।

​দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভূমি কার্যালয়কে ঘিরে সাধারণ মানুষের হয়রানি ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের পুরোনো। কিন্তু খিলক্ষেত টানপাড়ার ঘটনাটি দেশের সমগ্র ভূমি প্রশাসনের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ও দুঃখজনক নজির। যেখানে কয়েক হাজার পরিবার সব ধরনের বৈধ দালিলিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে একই ভৌগোলিক সীমানায় অবরুদ্ধ হয়ে আছেন।

​এটি এখন আর কেবল একটি এলাকার সমস্যা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক ভূমি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর মস্ত বড় এক প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করেছে। যদি রাজধানী ঢাকার বুকেই সরকারি প্রজ্ঞাপন এবং খোদ জেলা প্রশাসনের অনাপত্তি সনদকে মাঠ পর্যায়ের কেরানি বা কর্মকর্তা অবজ্ঞা করতে পারেন, তবে প্রান্তিক অঞ্চলের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?

​একটি স্বাধীন দেশে সরকারি গেজেট, অনাপত্তি সনদ এবং চূড়ান্ত ভূমি রেকর্ড থাকার পরও যদি একজন নাগরিক নিজের জমির খাজনা দিতে না পারেন, তবে সেই ব্যর্থতার দায় কার? টানপাড়ার মানুষের সামনে আজ দুটি সরল প্রশ্ন।

প্রথমত, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দেওয়া সব শর্ত অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করার পরও কোন অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তারা মৌলিক ভূমি সেবা থেকে বঞ্চিত?

দ্বিতীয়ত, যদি নিয়মের বেড়াজালে সবকিছু বন্ধই থাকে, তবে পর্দার আড়ালে কোটি টাকার বিনিময়ে কিছু কাজ কীভাবে সম্পন্ন হচ্ছে?
​এই দুই প্রশ্নের সততাপূর্ণ ও নিরপেক্ষ উত্তর খোঁজা এখন রাষ্ট্র, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব। খিলক্ষেতের টানপাড়ার হাজারো পরিবার আজ চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে—কবে ঘুচবে তাদের এই পৈতৃক ভিটের পরবাসী জীবনের অভিশাপ, কবে মুক্ত হবে তাদের প্রাণের টানপাড়া।

​লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও আহ্বায়ক, নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ?

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন