বিজ্ঞাপন

স্বর্ণের বাজারে বড় ধস, কেন এই দরপতন?

দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা কমানো হয়েছে। আজ শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বাজুস।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) দাম কমেছে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন নির্ধারিত দাম আজ সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে।

নতুন দর অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ২৮ হাজার ৫৫৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১৮ হাজার ২৯২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৪০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৫৩ হাজার ১৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছিল বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। সেদিন ভরিতে ২ হাজার ৫০৮ টাকা ভ্যাট যোগ করার পর ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা। একই সময় ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা ওই দিন সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়।

সবমিলিয়ে চলতি বছরে এ পর্যন্ত দেশের বাজারে মোট ৭৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছে বাজুস। এর মধ্যে ৩৯ বার দাম বেড়েছে এবং ৩৮ বার কমেছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালে মোট ৯৩ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৬৪ বার বৃদ্ধি এবং ২৯ বার হ্রাস পেয়েছিল।

সোনার দাম কেন কমছে?

সাধারণত বৈশ্বিক অস্থিরতা বা সংকটের সময়ে বিনিয়োগকারীরা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এড়াতে সোনায় বিনিয়োগ বাড়ান, ফলে দামও বৃদ্ধি পায়। তবে এবার সেই পরিচিত প্রবণতার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর শুরু হওয়া কয়েক মাসব্যাপী সংঘাতের সময় থেকেই সোনার বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। ২৮ জানুয়ারি প্রতি ট্রয় আউন্স (৩১ দশমিক ১ গ্রাম) সোনার দাম ৫ হাজার ৩০৩ ডলারে উঠলেও শুক্রবার তা কমে ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে নেমে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পরিবর্তে তা বাড়াতে পারে বলে ধারণা জোরালো হয়েছে। এই মূল্যস্ফীতির পেছনে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান ওই জলপথে জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়ে আসছে। এর ফলে তেল ও গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুটে বিঘ্ন ঘটেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে এর প্রভাব মূল্যস্ফীতিতেও পড়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে দেশটির শ্রমবাজারও স্থিতিশীল রয়েছে। ফলে শিগগিরই সুদের হার কমার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

যদিও সোনা মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষার একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়, উচ্চ সুদের হার সাধারণত এর বাজারকে চাপে ফেলে। কারণ সোনা একটি ‘নন-ইল্ডিং’ বা আয়হীন সম্পদ। এর মূল্য বৃদ্ধি ছাড়া অন্য কোনো আয় তৈরি হয় না। অর্থাৎ, বিনিয়োগকারীরা মূলত দামের ঊর্ধ্বগতির প্রত্যাশায় সোনা কেনেন।

আর্থিক ওয়েবসাইট অপশনস্প্রেডার্স ডটকমের প্রধান অপশন বিশ্লেষক জাস্টিন কার্ডওয়েল আল জাজিরাকে বলেন, ‘সম্পদ হিসেবে সোনা বাস্তব অর্থের সবচেয়ে কাছাকাছি। এটি লভ্যাংশ দেয় না, আবার দাম না বাড়লে কোনো মূল্যও তৈরি করে না। মানুষ মূলত মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশায় সোনা কেনে।’

এ কারণে সুদের হার ও সোনা প্রায়শই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কাজ করে। কার্ডওয়েলের ভাষায়, ‘সুদের হার বেশি থাকলে এবং বিনিয়োগকারীরা ডলারে ঝুঁকলে বিনিয়োগ হিসেবে সোনার আকর্ষণ কমে যায়।’ ইরান যুদ্ধ ডলারের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। আর যেহেতু সোনার মূল্য ডলারে নির্ধারিত হয়, তাই সাধারণত ডলার ও সোনার মধ্যে বিপরীতমুখী সম্পর্ক দেখা যায়।

নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কলিন প্লুম আল জাজিরাকে বলেন, ‘ডলার শক্তিশালী হলে সোনার ওপর চাপ পড়ে, আর ডলার দুর্বল হলে সোনার দাম বাড়তে থাকে। বর্তমানে ডলার শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, আর সোনা সেই চাপ অনুভব করছে।’ তবে তার মতে, ডলার ও সোনার ভবিষ্যৎ মূল্য নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্লুম বলেন, ‘এ বছরের বাকি সময় এবং সম্ভবত আগামী কয়েক বছর আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এরপর কী হবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘কয়েক মাস আগেও ধারণা ছিল সুদের হার কমবে, ফলে বিভিন্ন সম্পদের দাম বাড়ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে। সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সব ধরনের সম্পদের ওপর পড়ে, তবে সোনা সুদের হারের পরিবর্তনের প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল।’

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।

তবে ফেডের সম্ভাব্য নীতিগত সিদ্ধান্তের পূর্বাভাস দেওয়া সিএমই ফেডওয়াচ টুলের হিসাব অনুযায়ী, ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা এখন ৫০ শতাংশের বেশি।

প্লুমের মতে, এ পরিস্থিতি সোনার দামের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তার ভাষায়, ‘সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি যেন দোলনার দুই প্রান্ত, আর মাঝখানে বসে আছে সোনা। ২০২৬ সালের বিশেষ বিষয় হলো—দুটোই একইসঙ্গে ঘটছে। আর এই মুহূর্তে সুদের হারই প্রাধান্য পাচ্ছে। এ কারণেই সোনার বাজার প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে।’

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সমঝোতার খবর প্রকাশের পর সোনার দাম আগের দিনের তুলনায় কিছুটা বেড়ে লেনদেন শেষ করে। কার্ডওয়েল বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনার খবর সোনার জন্য ইতিবাচক, কারণ এতে মূল্যস্ফীতি কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

তবে এই প্রক্রিয়ার প্রভাব দৃশ্যমান হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, ‘বর্তমানে সোনা যে মূল্যসীমায় অবস্থান করছে, সেটি শক্তিশালী সমর্থন স্তর হতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলেও আরও বেশ কিছু বিষয় রয়েছে, যা সোনার দামের ঊর্ধ্বগতি সীমিত রাখতে পারে।’

উল্লেখ্য, বিগত ২০২৫ সালে দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দামের পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল, যার মধ্যে ৬৪ বার দাম বাড়ে এবং ২৯ বার কমেছিল। তবে চলতি ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতেই সমন্বয় ৭৭ বার ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাজারে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই স্থানীয় বাজারে এই বারবার দামের পরিবর্তন করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাজুস।

পড়ুন: প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে মেক্সিকো

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন