একসময় সংসারের একমাত্র ভরসা ছিলেন ইসরাফিল। কিন্তু সেই মানুষটিই আজ আর নেই। তার মৃত্যুর পর চার কন্যাসন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে স্ত্রী আরজু আক্তারের। মাথার ওপর ছাদ থাকলেও নেই নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস, নেই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। ফলে প্রতিটি দিনই এখন তাদের কাছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও আশ্রয়ন প্রকল্পের ২২০ নম্বর ঘরে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটি কক্ষে গাদাগাদি করে বসবাস করছে পরিবারটি। স্বামীর মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই সন্তানদের খাবার, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে লড়াই শুরু করতে হয়েছে আরজু আক্তারকে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১১ জুন স্ট্রোক করে মারা যান ইসরাফিল। তার মৃত্যুর পর থেকেই বন্ধ হয়ে যায় পরিবারের একমাত্র আয়ের পথ। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সংগ্রাম করেও পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছিলেন তিনি।
জানা গেছে, প্রায় ১৫ বছর আগে চাকরির সুবাদে পটিয়ায় আসেন ইসরাফিল। পল্লী বিদ্যুতে কাজ করার সময় ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ লাইনে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। ওই দুর্ঘটনায় তার একটি হাত ও একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর আর স্বাভাবিক কোনো কাজ করতে না পেরে ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে কোনোমতে সংসার চালাতেন।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও চার কন্যাসন্তান রেখে গেছেন। বড় মেয়ে ইয়াছমিনের বিয়ের জন্য একটি এনজিও থেকে ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। কিছু কিস্তি পরিশোধ করা হলেও এখনও ঋণের বড় অংশ বাকি রয়েছে। মেজ মেয়ে ইয়ানুর স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ছোট দুই সন্তান এখনও শিশু।
স্বামীকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরজু আক্তার বলেন, “স্বামী বেঁচে থাকলেও অনেক কষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি কোনো না কোনোভাবে সংসার চালাতেন। এখন মেয়েদের নিয়ে কীভাবে চলব, কীভাবে তাদের মানুষ করব বুঝতে পারছি না। অনেক সময় খাবার জোগাড় করতেও কষ্ট হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইসরাফিল নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করে পরিবারের জন্য সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর পরিবারটি সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েছে।
তাদের অভিযোগ, মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি সহায়তা পরিবারটির কাছে পৌঁছেনি। ফলে চার কন্যাসন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তাদের মা।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন বলেন, পরিবারটির জন্য জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য সহায়তা, ভাতা এবং শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তা না হলে শিশুদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
এ বিষয়ে পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানুর রহমান বলেন, “পরিবারটির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তাদের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সরকারি সহায়তার আওতায় আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এলাকাবাসীর দাবি, জীবনের শেষ পর্যন্ত প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে পরিবারের জন্য সংগ্রাম করেছেন ইসরাফিল। এখন তার চার কন্যাসন্তান ও অসহায় স্ত্রীর পাশে সরকার, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি এবং মানবিক সংগঠনগুলো এগিয়ে আসুক। তাহলেই হয়তো পরিবারটি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবে।
পড়ুন: বৈশ্বিক তেল বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চীনের প্রভাব বাড়ছে: সিএনএন
আর/


