ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌরশহরের সড়কবাজার। ব্যস্ত সড়কের পাশে সারি সারি অটোরিকশা। মানুষের ভিড় ঠেলে ফুটপাত ধরে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছেন মুনসুর আলী। দুই হাতে ধরে রেখেছেন একটি বড় ট্রে। তাতে সারি সারি সাজানো মাথার কাঠি, চুলের ক্লিপ, ফুলের অলংকার, চাবির রিংসহ নানা রঙের ছোট ছোট প্রসাধনসামগ্রী।
হাঁটতে হাঁটতেই কখনো থামেন, ক্রেতাকে পণ্য দেখান, আবার এগিয়ে যান পরের গন্তব্যে। এই ট্রেটিই তাঁর দোকান, আর শহরের রাস্তাগুলোই তাঁর বাজার।
৪০ বছর বয়সী মুনসুর আলীর বাড়ি সিলেট সদর উপজেলার হাটখোলা এলাকায়। আখাউড়ার সড়কবাজারে পণ্য বিক্রির সময় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। কথায় কথায় উঠে আসে সংগ্রামে মোড়া জীবনের গল্প।
মাত্র চার বছর বয়সে বাবা আব্দুল ওয়াহিদকে হারান তিনি। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের অভাব-অনটনই হয়ে ওঠে তাঁর শৈশবের সঙ্গী। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও এরপর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট হয়েও জীবিকার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়।
একসময় দেশের বিভিন্ন মেলায় কসমেটিকস বিক্রি করতেন। কিন্তু হাতে সংক্রমণ হওয়ায় দীর্ঘ সময় মেলায় ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরে জীবিকার পথ বদলে নেন। এখন সিলেট থেকে বাকিতে পণ্য এনে বিভিন্ন শহর ও বাজারে ফেরি করে বিক্রি করেন। পণ্য শেষ হয়ে গেলে আবার নতুন করে মাল তুলে আনেন। এভাবেই চলছে তাঁর ছোট্ট ব্যবসা।
মুনসুর আলী বলেন, প্রতিদিন আট শ থেকে এক হাজার টাকার মতো বিক্রি হয়। সেই অর্থ থেকেই পণ্যের দাম পরিশোধ, সংসারের খরচ এবং তিন সন্তানের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন। প্রয়োজনে আত্মীয়স্বজনও কিছুটা সহযোগিতা করেন।
দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তাঁর সংসার। এর মধ্যেই তিনি ডায়াবেটিসে ভুগছেন। তবু অসুস্থতা তাঁকে ঘরে বসিয়ে রাখতে পারেনি। কারণ, একদিন কাজ না করলে সংসারের আয়ও থেমে যায়।
মুনসুর আলী বলেন, “ছোটবেলা থেকেই কাজ করছি। কষ্ট আছে, কিন্তু কাজ না করলে তো সংসার চলবে না। আল্লাহ যত দিন শক্তি দেবেন, তত দিন এভাবেই ফেরি করে পণ্য বিক্রি করে যাব।”
আখাউড়ার ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন শত শত মানুষ তাঁর পাশ দিয়ে হেঁটে যান। কেউ একটি মাথার কাঠি কেনেন, কেউ একটি চুলের ক্লিপ। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, সেই ছোট্ট পণ্যগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন বাবার অবিরাম সংগ্রাম, তিন সন্তানের ভবিষ্যতের স্বপ্ন এবং প্রতিকূলতার কাছে মাথা নত না করা এক মানুষের নীরব লড়াই। তাঁর হাতে ধরা ট্রেটি শুধু পণ্যের নয়, একটি পরিবারের বেঁচে থাকার আশারও বাহক।
পড়ুন : বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপে উত্তাল সাগর: ৪ সমুদ্র বন্দরে সতর্কবার্তা
সা/


