একসময় অন্য সবার মতোই ছিল তার স্বাভাবিক জীবন। ছিল স্বপ্ন, ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনা, ছিল সংসার গড়ার ইচ্ছে।পরিবার-পরিজনকে নিয়ে সুখী জীবনের স্বপ্ন দেখতেন সুনামগঞ্জের আকলিমা। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দেয় তার জীবনের পুরো গল্প।
সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের চিনাকান্দি বালুচর গ্রামের মৃত আব্দুর রাশিদের মেয়ে আকলিমা। প্রায় সাত বছর ধরে হুইলচেয়ার আর বিছানায় বন্দি জীবন কাটছে তার। একসময় যিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতেন, সংসারের কাজ করতেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন, আজ সেই আকলিমার দিন কাটছে অন্যের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাত বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন আকলিমা। দুর্ঘটনায় তার মেরুদণ্ড ও দুই পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর দীর্ঘ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করানো হলেও আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি।
বর্তমানে নিজের পায়ে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরাও করতে পারেন না আকলিমা। দৈনন্দিন ছোট ছোট প্রয়োজন মেটাতেও পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা নিতে হয়। বিছানা থেকে হুইলচেয়ারে বসা, ঘরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া—সবকিছুতেই প্রয়োজন হয় অন্যের সহায়তা। আকলিমার দীর্ঘ এই সংগ্রামের সবচেয়ে বড় সহযোদ্ধা তার মা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মেয়ের সেবাযত্নে ব্যস্ত থাকেন তিনি। একজন মায়ের চোখে আজও বেঁচে আছে সেই আশা—একদিন হয়তো তার মেয়ে আবার নিজের পায়ে দাঁড়াবে, আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে।
আকলিমার পরিবারে সদস্য সংখ্যা প্রায় ১০ জন। পরিবারের অধিকাংশ সদস্য দিনমজুরির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। দিন শেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে চলে সংসার। নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে আকলিমার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, ওষুধ ও পুনর্বাসনের ব্যয় বহন করা পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, আকলিমার চিকিৎসার জন্য ইতোমধ্যে তাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। চিকিৎসা করাতে গিয়ে ব্যয় হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ। অনেক সময় ধার-দেনা করেও চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন তারা। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
আকলিমা বলেন, “আমি আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। সবার মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে চাই। কিন্তু চিকিৎসার খরচ বহন করা আমাদের পরিবারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। যদি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহযোগিতা পাই, তাহলে হয়তো আবার সুস্থ হয়ে উঠতে পারবো।” স্বজনরা জানান, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা গেলে আকলিমার অবস্থার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং মানবিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা কামনা করেছেন তারা।
সাত বছরের দীর্ঘ এই লড়াইয়ে এখনও হার মানেননি আকলিমা। এখনও তিনি স্বপ্ন দেখেন—আবার হাঁটবেন, আবার নিজের পায়ে দাঁড়াবেন, আবার ফিরে পাবেন স্বাভাবিক জীবন।আকলিমার এই গল্প শুধু একজন মানুষের নয়; এটি একটি পরিবারের সংগ্রামের গল্প। এটি বেঁচে থাকার গল্প, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প, এবং আশা ধরে রাখার গল্প। পরিবারের আশা, সমাজের সহমর্মিতা, মানবিক সহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেলে হয়তো আবারও নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবেন আকলিমা। আর সেই অপেক্ষাতেই দিন গুনছে একটি পরিবার।
পড়ুন : ঐতিহাসিক ‘দেওয়ানের পুল’র সংস্কার কাজ পরিদর্শনে এমপি এমরান


