বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি কাকে করা হবে সে নিয়ে নানা আলোচনা ছিল গত কয়েকমাস ধরে। ১৩ই অগাস্ট দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণার পর দলের মহাসচিবের পদটিও শূন্য হতে চলেছে।
জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। যে কারণে তার শূন্য পদে আগামীতে কে হবেন বিএনপির মহাসচিব সেটি নিয়েও নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রথমে ভারপ্রাপ্ত তারপর কাউন্সিলের মাধ্যমে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর প্রায় ১৬ বছর ধরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এই পদে আসীন ছিলেন বর্ষীয়ান এই নেতা।
তার এই পদে ভবিষ্যতে কে দায়িত্ব পালন করবেন, সেই প্রশ্নে দলের ভেতর কিংবা বিভিন্ন গণমাধ্যমে কয়েকজন নেতার নামই ঘুরেফিরে আসছে।
তবে, বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন দলের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কাউকে এই পদের জন্য চূড়ান্ত বা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের স্থায়ী মহাসচিব নির্বাচিত হন জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে। তার আগে পর্যন্ত কোনো নেতা সাময়িকভাবে বা ভারপ্রাপ্ত হিসাবে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে যিনি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব আছেন রুহুল কবির রিজভী, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিনিই ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হবেন।
মির্জা ফখরুল ইসলামের আলমগীরের স্থলে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মি. রিজভীর বিষয়টি দলের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হলেও পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারেনি কেউ।
কেননা, এক্ষেত্রে মি. রিজভী ছাড়াও আরো দুই তিনজনের নাম দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা আলোচনায় শোনা গেছে। যদিও সে বিষয়গুলো নিয়ে দলীয় হাইকমান্ড বা স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এখনো আলোচনা হয়নি।
বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে কিংবা সেই সময়ে পূর্ণাঙ্গভাবে কাউকে মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে আর আগ ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মি. রিজভী দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি। পার্টি যেটা সিদ্ধান্ত নেবে, সেটার জন্যই অপেক্ষা করে আছি”।
তবে বিএনপির নেতারা আভাস দিয়েছেন, দলীয় ফোরামে আলোচনা হলেও মহাসচিব কে হবেন, সেটা মূলত নির্ভর করবে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের ওপরে।
বিএনপির সিনিয়র নেতা খন্দকার দেলোয়ার হোসেন দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়েছিলেন ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে।
২০১১ সালে খন্দকার দেলোয়ার যখন মারা যান তখন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মি. হোসেনর মৃত্যুজনিত কারণে পদ শূন্য হলে তখন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয় মি. আলমগীরকে। পরে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ায় পর এখন বাকি শুধু ভোটের আনুষ্ঠানিকতা। কারণ সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপির প্রার্থী মি.আলমগীরের বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত।
ফলে আগামী ২০ তারিখ ভোটের ফলাফলের পর মহাসচিব পদে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখনো কিন্তু প্রার্থী। তিনি এখনো নির্বাচিত হন নি। সেই হিসেবে এখনো মহাসচিব পদটা শূন্য হয়নি। যখন তিনি শপথ নিবেন বা নির্বাচনে জিতে যাবেন তখন তার এমপি পদসহ সব পদই শূন্য হবে”।
দলের কয়েকটি সুত্র বলছে, প্রাথমিকভাবে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তারপর দল থেকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব যখন দেওয়া হবে তখন এই পদে রুহুল কবির রিজভী থাকতেও পারেন বা তার পরিবর্ততে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়াও হতে পারে।
মি. রিজভী বিবিসি বাংলাকে বলেন, “কখনো কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব পদ দেওয়া হয়েছে, কখনো আবার আবার কাউন্সিল ছাড়াও মহাসচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটার সমস্ত ক্ষমতা দেওয়া আছে চেয়ারম্যানকে। এই দায়িত্ব কাউন্সিল থেকেই দেওয়া হয়েছে”।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নানান চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে বিএনপির রাজনীতি। মাঠে থেকে যে রাজনীতিবিদ দলীয় দায়িত্ব পালন করছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পর ছিল রুহুল কবির রিজভীর নাম।
সেই হিসেবে দলীয় কর্মী সমর্থক থেকে শুরু করে সিনিয়র নেতাদেরও অনেকেই মনে করছেন প্রাথমিকভাবে এই পদে মি. রিজভীকেই মহাসচিব পদের জন্য তার নামটি সবচেয়ে এগিয়ে।
যদিও বাংলাদেশের কোন কোন গণমাধ্যমের খবরে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ আরো কয়েকজন সিনিয়র নামও সম্ভাব্য হিসেবে সামনে আসছে। সেখানে বলা হয়েছে, সালাহউদ্দিন আহমদকে মন্ত্রণালয় বদলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দেওয়া হতে পারে। অতীতে রাজনৈতিক দলগুলোর মহাসচিব বা সাধারণ সম্পাদককে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেখা গেছে।
বাংলাদেশের কোনো কোনো গণমাধ্যমে সম্ভাব্য মহাসচিব হিসাবে দুই যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দিন চৌধুরী অ্যানি ও হাবিব উন নবী খান সোহেলের নামও এসেছে।
তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মিজ রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নাম আমরা শুনি। কিন্তু পার্টির ভেতর তো এ নিয়ে কোন আলোচনা হয়নি। এই যে নামগুলো আসে, নিউজগুলো আসে, নেতাকর্মীরা যা বলতে থাকে সেই পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যম বলে থাকে”।
তিনি বলছিলেন, “মহাসচিব হওয়ার মতো যোগ্য তো অনেকেই আছেন। প্রশ্নটা হলো- নিয়ম অনুযায়ী আপাতত রুহুল কবির রিজভী হওয়ার কথা। প্রোটকল অনুযায়ী উনি আসছেন। যদি অন্য কিছু হয় সেটা পরের ব্যাপার”।
সূত্র : বিবিসি বাংলা


