৪৮ দলের বিশ্বকাপে শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছে একের পর এক অঘটন ও চমক। তুলনামূলক দুর্বল র্যাঙ্কিংয়ের দলগুলো শুধু প্রতিরোধই গড়ছে না, স্পেন, ইংল্যান্ড, ইকুয়েডর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে পয়েন্টও কেড়ে নিচ্ছে। কেপ ভার্দে, কুরাসাও, ঘানা ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলগুলো ইতিমধ্যেই নিজেদের সংগঠিত ফুটবল দিয়ে নজর কেড়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে—এগুলো কি শুধুই অঘটন, নাকি আধুনিক ফুটবলের নিখুঁত কৌশলগত পরিকল্পনার ফলাফল?
ম্যাচ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ছোট দলগুলোর সাফল্যের পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট ট্যাকটিক্যাল প্যাটার্ন। সবচেয়ে বড় উদাহরণ কেপ ভার্দের স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র। ইতিহাসে অন্যতম ছোট দেশটি ম্যাচে ৪-৫-১ রক্ষণাত্মক বিন্যাসে খেলতে নেমে মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগের মধ্যে দূরত্ব প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনে। ফলে স্পেনের পক্ষে মাঝখান দিয়ে আক্রমণ গড়ে তোলা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সাধারণত দখলভিত্তিক দলগুলো প্রতিপক্ষকে ওপরে টেনে এনে ফাঁকা জায়গা তৈরি করে। কিন্তু কেপ ভার্দে সেই ফাঁদে পা দেয়নি। তারা শৃঙ্খলিতভাবে নিজেদের ব্লক ধরে রাখে এবং স্পেনের ডিফেন্ডাররা বল নিয়ে এগোলেও অযথা প্রেসিংয়ে যায়নি। এতে স্পেন বাধ্য হয় উইং এবং লম্বা বলের ওপর নির্ভর করতে।
পরিসংখ্যানেও এই রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলার প্রতিফলন দেখা যায়। স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের প্রেসিং ইনটেনসিটি ছিল ৫১.২, যেখানে স্পেনের ছিল মাত্র ৫.৯। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ১৫ মিনিটে ঘানার ইনটেনসিটি পৌঁছে যায় ৬২-তে। অর্থাৎ ছোট দলগুলো সচেতনভাবেই বলের দখল ছেড়ে দিয়ে প্রতিপক্ষকে নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে রাখার কৌশল নিয়েছে।
তবে ম্যাচের শেষ দিকে অনেক দলই এই রক্ষণ ভেঙে আক্রমণে যায়। কেপ ভার্দে ও ঘানা উভয় দলই তখন সুযোগ বুঝে কাউন্টার অ্যাটাকে ঝুঁকি নেয়, যা তাদের ফল বদলে দেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করে।
অন্যদিকে বিশ্লেষণে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট—পাঁচ ডিফেন্ডার মানেই নিরাপত্তা নয়। সৌদি আরবের ৪-০ গোলে স্পেনের কাছে হার সেটিই প্রমাণ করে। অতিরিক্ত বল-ফলো করার প্রবণতায় তাদের ডিফেন্সিভ লাইন ভেঙে যায় এবং স্পেন দ্রুত পাশ বদলে সংখ্যাগত সুবিধা তৈরি করে গোল আদায় করে।
ছোট দলগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো গোলরক্ষক থেকে বিল্ড-আপ শুরু করা। কেপ ভার্দে, ইরাক ও দক্ষিণ আফ্রিকা গোলকিক থেকেই শর্ট পাসে খেলা শুরু করে প্রতিপক্ষকে ওপরে টেনে আনে। এতে বড় দলগুলো প্রেস করতে গিয়ে নিজেদের ফাঁকা জায়গা রেখে দেয়।
তবে এই কৌশল ঝুঁকিপূর্ণও। দক্ষিণ আফ্রিকা মেক্সিকোর বিপক্ষে এবং ইরাক নরওয়ের বিপক্ষে নিজেদের অর্ধে বল হারিয়ে গোল হজম করেছে। কিন্তু একই পদ্ধতিতে তারা একাধিক পরিষ্কার আক্রমণও তৈরি করেছে, যা সঠিক বাস্তবায়নে ম্যাচের ফল বদলে দিতে পারে।
সবশেষে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যও বড় পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে। ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দেকে ঐতিহাসিক ড্র এনে দেন। কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলোয় রুম এক ম্যাচে ১৫টি সেভ করে বিশ্বকাপের রেকর্ডে নাম লেখান।
সবচেয়ে বড় চমক এখনো সামনে। নকআউট পর্বে কেপ ভার্দের প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও স্পেনের মতো দলকে আটকে দেওয়া এবং আক্রমণে দক্ষতা দেখানো কেপ ভার্দে ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে—এই ম্যাচে “আন্ডারডগ” শব্দটি আর আগের মতো সহজ নয়। এক ম্যাচেই ইতিহাস উল্টে দেওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে, সেটাই এখন বিশ্ব ফুটবলের নতুন আলোচ্য বিষয়।
পড়ুন: ইতিহাস গড়ে প্রথমবার নকআউটে কেপ ভার্দে
আর/


