ভয়াবহ দুটি ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলাজুড়ে অব্যাহত রয়েছে আফটারশক। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৫ শতাধিক আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে ধসে পড়া অসংখ্য ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলতে থাকায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৭০০ ছাড়িয়েছে। এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
জাতিসংঘ ও ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা কমে আসছে। এ পরিস্থিতিকে দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের ‘সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও মিলেছে আশার খবর। সোমবার লা গুয়াইরা রাজ্যের কারাবালেদা শহরে ধসে পড়া একটি ভবনের নিচে টানা ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে থাকার পর ২১ বছর বয়সী অ্যারন লেভি কান্তিয়ো ভার্গাসকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ভেনেজুয়েলা, মেক্সিকো ও এল সালভাদরের যৌথ উদ্ধারকারী দল দীর্ঘ চেষ্টার পর তাকে উদ্ধার করে। এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নাইব বুকেলে জানান, ওই তরুণকে বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোলা দেল তিনদারো জানান, গত বুধবার উত্তরাঞ্চলের লা গুয়াইরা রাজ্যে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এরপর থেকেই একের পর এক আফটারশক অনুভূত হচ্ছে, যার সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫০০ ছাড়িয়েছে।
সোমবার ভোরেও ৪.৬ মাত্রার একটি আফটারশক লা গুয়াইরা ও রাজধানী কারাকাসে অনুভূত হলে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২ হাজার ৫০০ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর বেশির ভাগই সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। সম্ভাব্য আরও প্রাণহানির আশঙ্কায় উদ্ধার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ১০ হাজার মরদেহ রাখার ব্যাগ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
ভূমিকম্পের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ভেনেজুয়েলার বহু দুর্গম ও উপকূলীয় এলাকায় পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পৌঁছেনি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। বাধ্য হয়ে অনেকেই হাতুড়ি ও গাঁইতির মতো সাধারণ সরঞ্জাম দিয়ে নিজেরাই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খোঁজ চালাচ্ছেন।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা ও পাশের শহর কাতিয়া লা মারে উদ্ধারকাজে মূল ভূমিকা পালন করছেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও বিদেশি উদ্ধারকর্মীরা। স্থানীয় বিদ্যুৎকর্মী রুবেন রোহাস বলেন, সিভিল প্রোটেকশনের সদস্যরা সাহায্য করতে চাইলেও তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। সরকারের পক্ষ থেকেও পর্যাপ্ত সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়নি।
কারাকাসের পশ্চিমের পাহাড়ি এলাকা এল হুনকিতোর বাসিন্দারাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি খুবই সীমিত, আর স্থানীয় কৃষকেরাই খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
১৫ বছর ধরে লা গুয়াইরায় বসবাসকারী জুলি মারিন বলেন, তিনি তার ভাইঝি ও ভগ্নিপতিকে হারিয়েছেন। তার ভাষ্য, ভারী যন্ত্রপাতি দ্রুত পৌঁছালে আরও অনেক মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতো।
তবে এসব অভিযোগের বিপরীতে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দাবি করেছেন, ২৫ হাজারের বেশি জরুরি কর্মী, পুলিশ ও সেনাসদস্য দুর্গত এলাকায় কাজ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, প্রতিটি উদ্ধার হওয়া জীবনই একটি বিজয়।
ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নে তিনি জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিশন গঠন করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে লাল, হলুদ ও সবুজ সংকেত দিয়ে চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি গৃহহীনদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরও নির্মাণ করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার এই মানবিক সংকটে আন্তর্জাতিক সহায়তাও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র আগের ১৫ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে নতুন করে ৩০ কোটি ডলারের বেশি আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছে। চিকিৎসা, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ত্রাণসামগ্রীর পাশাপাশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ফোর্ট লডারডেল লা গুয়াইরা উপকূলে অবস্থান নিয়ে মেরিন সদস্যদের মাধ্যমে সরাসরি ত্রাণ বিতরণ করছে।
এদিকে চীন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস জরুরি ত্রাণসামগ্রী বহনকারী একটি বড় জাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
পড়ুন: নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে হারিয়ে রাউন্ড অব সিক্সটিনে মরক্কো
আর/


