বিজ্ঞাপন

ধারের টাকা চাওয়ায় চাচা চাচির বিরুদ্ধে মানব পাচারের মামলা করল ভাতিজা

একজন ভাতিজার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে চাচা-চাচিরা নিজেদের সঞ্চয়, স্বর্ণালংকার, এমনকি সম্পত্তিও বন্ধক রেখেছিলেন। পরিবারের দাবি, সেই সহায়তায় বিদেশে গিয়ে ভাগ্য বদলালেও দেশে ফিরে ধার করা টাকা পরিশোধ তো করেনইনি, উল্টো পাওনা চাইতে গিয়ে মানবপাচারের মামলার আসামি হতে হয়েছে তাদের। এমন অভিযোগকে ঘিরে এখন উত্তপ্ত মাদারীপুর সদর উপজেলার দত্তকেন্দুয়া ইউনিয়নের শ্রীনাথদী গ্রাম।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দুপুরে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং ধার করা অর্থ ফেরতের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন। নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

চাচি ফাতেমা আক্তার রিতা বলেন,”স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে টাকা দিয়েছি”। তার অভিযোগ, প্রায় দুই বছর আগে তার ভাসুর ফজলু শিকদারের ছেলে মেহেদী হাসান ইতালি যাওয়ার প্রস্তুতির সময় তার চাচি ফাতেমা আক্তার রিতার কাছ থেকে প্রথমে ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা ধার নেন। পরে ২০২৫ সালের জুন মাসে লিবিয়ায় আটকে পড়ার কথা জানিয়ে আরও অর্থের প্রয়োজনের কথা বলেন। মানবিক বিবেচনায় পরিবার স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে ও ধার করে আরও ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেন। সব মিলিয়ে তার কাছে দেওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা।

ফাতেমা আক্তার রিতা বলেন, “ছেলের মতো ভেবেই তাকে সাহায্য করেছি। আজ সেই টাকার দাবি করায় উল্টো আমাদেরই মানবপাচারের মামলায় জড়ানো হয়েছে।”

অন্য চাচি হেনা বেগমের অভিযোগ, ইতালির স্পন্সর ভিসার কথা বলে তার কাছ থেকেও ৫ লাখ টাকা ধার নেন মেহেদী হাসান। সেই অর্থ জোগাড় করতে তাকেও সম্পত্তি ও স্বর্ণালংকার বন্ধক রাখতে হয়েছে।

মেহেদীর চাচা কামাল শিকদার জানান, বিদেশ পাঠানোর জন্য তিনি ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই টাকা ফেরত চাইতেই তাকেও মানবপাচারের মামলায় আসামি করা হয়েছে।

চাচি বকুল বেগমের দাবি, তিনি ১ লাখ টাকা দিয়েছিলেন।তিনি বলেন, “যখন তারা ঠিকমতো খেতে পারত না, তখন আমরা পাশে দাঁড়িয়েছি। আজ আমাদের টাকা নিয়ে উল্টো আমাদেরই হয়রানি করছে। টাকা চাইতে গিয়েই মানবপাচারের মামলার আসামি হতে হয়েছে।”

পরিবারের আরেক সদস্য লুৎফর শিকদার জানান, তিনিও ৫ লাখ টাকা দিয়েছেন। পরিবারের দাবি, বিভিন্ন চাচা-চাচি ও স্বজনদের কাছ থেকে বাড়ি বন্ধক, সম্পত্তি বিক্রি, স্বর্ণালংকার বন্ধক এবং ধার করে মেহেদী হাসানের বিদেশযাত্রার জন্য মোট ১৫ লাখ টাকারও বেশি সংগ্রহ করা হয়েছিল।

টাকা ফেরতের দাবি, এরপরই দ্বন্দ্ব

পরিবারের ভাষ্য, বিদেশে অবস্থানকালে মেহেদী হাসান ভালো আয় করেন। দেশে ফিরে ব্যবসা শুরু করেন এবং বাড়িঘর নির্মাণ করেন। কিন্তু ধার করা টাকা ফেরত চাইলে তিনি নানা অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যান।অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২ মে ২০২৬ বিকেলে পাওনা টাকা চাইতে গেলে মেহেদী হাসান ক্ষিপ্ত হয়ে গালিগালাজ করেন, টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ হলেও কোনো সমাধান না হওয়ায় পরিবার থানায় লিখিত অভিযোগ করে।

পরিবারের দাবি: অভিযোগের পরই মানবপাচারের মামলা

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, থানায় অভিযোগ করার পর পাল্টা মানবপাচারের মামলা করেন গত ২৮ শে জুন মেহেদী হাসান। সেই মামলায় চাচা কামাল শিকদার, নজরুল শিকদার, চাচি ফাতেমা আক্তার রিতা, বকুল বেগমসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে আসামি করা হয়েছে।

তাদের ভাষ্য, “এটি মূলত পাওনা টাকা আদায়ের দাবিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার একটি অপচেষ্টা।”

এলাকাবাসী: “যারা ভবিষ্যৎ গড়তে চেয়েছিলেন, তারাই আজ আদালতের পথে”

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এলাকাবাসী বলেন, ছোটবেলায় মা হারানোর পর মেহেদী চাচা-চাচিদের স্নেহেই বড় হয়েছেন। নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করে তারা তাকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “যারা নিজেদের গয়না বন্ধক রেখে একজনের ভবিষ্যৎ গড়তে চেয়েছিলেন, আজ তারাই যদি মিথ্যা মামলার আসামি হন, তাহলে সমাজে মানবিকতার জায়গা কোথায়? আমরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা চাই।”

অভিযুক্ত মেহেদী হাসান সব অভিযোগ স্বীকার করে মেহেদী হাসান বলেন, “আমি তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলাম। তবে তারা আমার কাছ থেকেও অনেক বেশি টাকা নিয়েছে। এখন তারা আমাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করছে।”

মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমার জানা নেই। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

একদিকে পরিবারের আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে প্রতারণার অভিযোগ, অন্যদিকে পাল্টা মানবপাচারের মামলা দুই পক্ষের বিপরীতমুখী বক্তব্যে ঘটনাটি এখন মাদারীপুরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের মতে, সত্য উদঘাটিত হলেই স্পষ্ট হবে এটি কি পাওনা টাকা আদায়ের বিরোধ, নাকি এর আড়ালে রয়েছে আরও বড় কোনো বাস্তবতা।

পড়ুন:গোয়াইনঘাটে নকলমুক্ত ও শান্ত পরিবেশে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু: প্রথম দিনে অনুপস্থিত ১৭

দেখুন:ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভেনেজুয়েলায় স্বাস্থ্য সংকটের আশঙ্কা |

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন