বিশাল আকৃতির একটি বটগাছ। গাছের কাণ্ড থেকে শুরু করে ডালপালা সবখানেই আকাশি ও সাদা রঙের ছোঁয়া। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, প্রকৃতি যেন আর্জেন্টিনার চিরচেনা পতাকার সাজে সেজেছে। যেন আর্জেন্টিনার পতাকাই আকাশ ছুঁয়ে ভক্তদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী আজগড়া-জামতৈল খেয়াঘাটের পূর্বপাশে যমুনার চরে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন। স্থানীয়দের চাঁদায় প্রায় ১০ হাজার টাকার রঙ কিনে যুবক, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সি ১৯ জন প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বটগাছটি রাঙিয়েছেন। বটগাছটি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। এটি দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ফুটবলপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন। কেউ সেলফি তুলছেন, আবার কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছেন।
ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের অন্য এক উন্মাদনা। আর ফুটবল বিশ্বকাপ আসলেই প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে ভক্তদের দেখা যায় নানা রকম কাজকর্ম। কেউ তৈরি করেন দীর্ঘ পতাকা, কেউ নিজের বাড়ি রাঙিয়ে তুলেন প্রিয় দলের পতাকার রঙে, কেউ নিজের গাড়ি সাজান। চলতি ফুটবল বিশ্বকাপে গ্রামের আর্জেন্টিনার ভক্তরা পুরো একটি গাছ কে রাঙিয়ে তুলেছেন আকাশী- সাদা রঙে। আড়াই যুগেরও বেশি পুরোনো এই বটগাছটি এতদিন যমুনার চরের ক্লান্ত পথিকদের ছায়া দিত। এখন এটি ‘আর্জেন্টিনা বটগাছ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। নীল-সাদা রঙে সজ্জিত গাছটি চার রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে যেন সমর্থকদের স্বাগত জানাচ্ছে। গাছের ওপরে বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার পতাকা উড়ছে। নিচে চায়ের দোকানে বড় পর্দায় খেলা উপভোগ করছেন সমর্থকেরা। সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে দেখা গেল এই ব্যতিক্রমী কাণ্ড।
বেলকুচি উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের আজুগড়া এবং জামতৈল ইউনিয়নের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অনন্য এই গাছটি গ্রামের আর্জেন্টিনার ভক্তরা তাদের প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসায় প্রকাশে পাকড় গাছকেই রাঙিয়ে তুলেছেন। এই পুরো গাছটি রাঙাতে যে খরচ হয়েছে, সে খরচ কোনো একজন দেননি। গ্রামবাসির কারও কাছ থেকে ৫ টাকা, কারও ১০ টাকা, আবার কারও ১০০ টাকা এভাবেই ১০ হাজার টাকা তুলে রঙিন হয়েছে প্রিয় দলের প্রতি এই নিখাদ ভালোবাসা প্রকাশ্যে আমরা এই গাছটি সাজিয়েছি। দূর থেকে দেখলেই মনে হবে যেন আর্জেন্টিনার বিশালাকার এক পতাকা দাঁড়িয়ে আছে আকাশের নিচে। উন্মাদনার এই শুরুটা অবশ্য এখন নয়। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেই প্রথমবার গাছটিকে এভাবে সাজিয়েছিলেন তারা। এবার ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে নতুন করে গাছটি রাঙানো হয়েছে আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে। কোনো ব্যক্তিবিশেষ নয়, বরং এলাকার প্রবীণ থেকে শুরু করে তরুণ সবাই মিলে মেতে উঠেছেন এই ফুটবল উৎসবে। বিশ্বকাপের ম্যাচ উপভোগ করতে চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে জড়ো হন। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার ম্যাচ থাকলে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। রান্না করা খাবারের আয়োজন, সাউন্ড সিস্টেম ও আলোকসজ্জাও থাকে। এসব আয়োজনের জন্য স্থানীয়রাই চাঁদা তোলেন।
আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা মো. রাসেল হোসেন বলেন, আর্জেন্টিনা আমাদের আবেগের নাম। সেই ভালোবাসা প্রকাশ করতেই ২০২২ সালে প্রথম গাছটিকে রঙ করি। এবার বিশ্বকাপে আবারও নতুন করে সাজানো হয়েছে। এই আয়োজন কারও একার নয়, এলাকার সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্থ ও শ্রম দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ফুটবল আমাদের আনন্দের উৎসব। আমরা যে যার পছন্দের দলকে সমর্থন করি, কিন্তু সম্পর্কের জায়গায় কোনো বিভেদ নেই। বিশ্বকাপ এলে পুরো এলাকা উৎসবের গ্রামে পরিণত হয়।
আর্জেন্টিনা পতাকার আদলে নিজের রিকশা সাজানো চালক বলেন, রিকশাই আমার জীবিকা। কিন্তু আর্জেন্টিনা আমার ভালোবাসা। তাই নিজের রিকশাটাকেও প্রিয় দলের রঙে সাজিয়েছি। যাত্রীরাও রিকশা দেখে ছবি তোলেন, ভালো লাগে।
উদ্যোক্তা ও আজেন্টিনা সমর্থক কাওসার আহমেদ বলেন, দ্বিতীয়বারের মতো এই বটগাছটি নীল-সাদা রঙে রাঙানো হয়েছে। প্রিয় দল আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা এবং ফুটবল তারকা লিওনেল মেসির বিদায়ী বিশ্বকাপকে স্মরণীয় করে রাখতেই আমাদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। তিনি আরও বলেন, ফুটবলের উন্মাদনা এখন যমুনার চরেও ছড়িয়ে পড়েছে। সারা দিনের কাজ শেষে বিকাল বা সন্ধ্যায় এখানে বসে সবাই আলোচনা করেন ২০২৬ বিশ্বকাপের ট্রফি শেষ পর্যন্ত কোন দল জিতবে।
অনেক দূরের দেশ আর্জেন্টিনা হয়তো জানবেও না বেলকুচির এই গাছটির কথা। তবে ফুটবল যে ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে পারে, সিরাজগঞ্জের এই আকাশি-সাদা গাছটি যেন তারই এক অনন্য প্রতীক হয়ে থাকবে।
পড়ুন : ফিরে দেখা: জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে রক্তাক্ত দিনগুলোর একটি ১৯ জুলাই
সা/


