ভোলা ভোলার চরনোয়াবাদ এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে একটি অসহায় পরিবারকে পৈতৃক ভিটা থেকে উচ্ছেদের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। প্রভাবশালী চক্রের একের পর এক হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর, মারধর এবং উল্টো মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির কারণে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ভুক্তভোগী পরিবারটি। অভিযোগ উঠেছে, অভিযুক্ত পরিবারের দুই ছেলে পুলিশ সদস্য এবং জামাতা সেনা সদস্য হওয়ায়, সেই ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এই নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
এ ঘটনায় আদালতে মামলা হলেও পুলিশ কোনো আসামিকে গ্রেফতার করেনি। উল্টো প্রতিপক্ষের দায়ের করা মামলায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যকে গ্রেফতার করায় পুরো পরিবার এখন চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, ভোলা পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের উত্তর চরনোয়াবাদ এলাকার বাসিন্দা মো. লোকমান ও তার পরিবার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমিতে বসবাস করছেন। অন্যদিকে, দৌলতখান উপজেলা থেকে আসা মোসলেউদ্দিনের পরিবার লোকমানদের পূর্বপুরুষের কাছ থেকে জমি কিনে একই বাড়িতে বসতি স্থাপন করে।
অভিযোগ রয়েছে, মোসলেউদ্দিন গংরা যতটুকু জমি ক্রয় করেছিলেন, তার চেয়ে বেশি জমি অবৈধভাবে ভোগদখল শুরু করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সত্তরের দশকে লোকমানের পূর্বপুরুষেরা একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন, যা বর্তমানেও আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এই জমি বিরোধ ও মামলাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা এবং একাধিকবার মারধরের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়ভাবে বহুবার শালিস-বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি।
সবশেষ গত ২৪ এপ্রিল ২০২৬, শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে মো. লোকমান তাদের ভোগদখলীয় জমির পাড়ে পাইলিংয়ের কাজ করতে গেলে বিরোধে রুপ নেয়। প্রতিপক্ষের মিরাজ গংরা প্রথমে গালিগালাজ শুরু করে। এর প্রতিবাদ করে লোকমান বাড়ির উঠানে প্রবেশ করা মাত্রই শরিফ, সাখাওয়াত, মিরাজ ও নাজমীন গংরা তাদের ওপর চড়াও হয়। এসময় শরিফ লোহার রড দিয়ে লোকমানের মাথায় আঘাতের চেষ্টা করলে তা কাঁধ ও মুখে লাগে। এতে তার সামনের একটি দাঁত ভেঙে যায় এবং দুটি দাঁত নড়ে যায়। এরপর সাখাওয়াত লোহার রড দিয়ে পিঠে সজোরে আঘাত করলে লোকমানের মেরুদ-রে হাড় ভেঙে যায়। লোকমান মাটিতে পড়ে গেলে ওড়না দিয়ে তার গলায় ফাঁস লাগিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালায় বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। স্বামীকে বাঁচাতে স্ত্রী তাসনুর বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ধাক্কা দিয়ে ফেলে মারধর করা হয়, যার ফলে তার কোমর ও মেরুদ-ে গুরুতর জখম হয়। তাসনুর ও তার ছেলে মো. হাবিব ঘরের ভেতর ঢুকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে৷ পরে স্থানীয়রা আহত লোকমানকে উদ্ধার করে ভোলা সদর হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠায়।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী তাসনুর বেগম বাদী হয়ে ভোলা আদালতে ৪ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা (মামলা নং সিআর-৬৩২/২০২৬ইং) দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হলেন, মো. শরিফ ওরফে টিম্পা (৩০), মো. সাখাওয়াত (৩৫), মো. রিয়াজ ওরফে মিরাজ (৪০) এবং নাজমীন সুলতানা (৪৫)। আদালত এই মামলায় ওয়ারেন্ট বা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি। প্রধান আসামি মো. শরিফ ভোলা সদর উপজেলার ১১নং এম হোসেন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মূল ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং তাদের এলাকা ছাড়া করতে মোসলেউদ্দিনের ছেলে মিরাজ হোসেন বাদী হয়ে উল্টো লোকমান, হাবিব ও তাসনুরসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে ভোলা থানায় একটি পাল্টা মামলা দায়ের করেন। গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দায়ের করা ওই মামলায় পুলিশ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের আটক করে। পরে লোকমান হোসেনের গুরুতর অসুস্থতা দেখে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও অন্য আসামিকে আদালতে চালান করে জেলে পাঠানো হয়।
লোকমান তিন মাস ধরে অসুস্থ অবস্থায় কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তার অসুস্থ বিধবা মাকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগী তাসনুর বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তারা ৬০ শতাংশ জমি কিনে জোরপূর্বক ৯০ শতাংশ দখল করে রেখেছে। এখন আমাদের থাকার শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিতে চায়। তারা প্রভাবশালী হওয়ায় এবং ঘরে পুলিশ-সেনাবাহিনীর সদস্য থাকায় প্রশাসনকে টাকা ও ক্ষমতা দিয়ে প্রভাবিত করছে। আমরা এই অত্যাচার থেকে বাঁচতে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত মোসলেউদ্দিন ও মিরাজ হোসেন বলেন, “আমরা পৈতৃক সূত্রে ৯০ শতাংশ জমি ক্রয় করে সেখানে ঘরবাড়ি বানিয়েছি। তারা আমাদের বিরুদ্ধে যে দেওয়ানি মামলা করেছিল, তাতে পরপর দুইবার আমাদের পক্ষে রায় এসেছে। তারা আপিল করায় মামলাটি এখন চলমান। ২৪ এপ্রিল লোকমান গংরা পুকুরে পাইলিং করতে গেলে আমার ভাই শরীফ তাদেরকে পাইলিং করতে নিষেধ করে। এক পর্যায়ে লোকমান গংরা আমার ভাই শরীফকে অতর্কিক হামলা, মারধর করে। আমার মা লুৎফুর নাহার সন্তানকে বাঁচাতে আসলে তাকেও মারধর করে। আমার মায়ের কাপড়-চোপর টাকা হেচরা করে ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় আমরা থানায় মামলা দায়ের করেছি। আমাদের বিরুদ্ধে আনা, বাড়ী থেকে উচ্ছেদ, মারধর ও লুটপাটের সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি সুরক্ষার জন্য ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
এদিকে, ভোলা সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি অনেক দিন পৃুর্বের হওয়ায় মনে পড়ছে না। তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে কথা বলে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও অভিযুক্তদের দায়ের করা মামলার দ্বিতীয় আসামি লোকমানকে আটক করা হলেও তিনি শারিরীকভাবে অসুস্থ হওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পড়ুন : সেনা আইনেই হবে মোজাফফর হোসেনের বিচার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সা/


