সিরাজগঞ্জ জাতীয় জুট মিলের কার্যক্রম বন্ধ দীর্ঘদিন ধরে। এই কারণে অবহেলায় পড়ে আছে সকল যন্ত্রপাতি। বর্তমানে অধিকাংশেই এখন মরিচা ধরেছে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) সকালে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সিরাজগঞ্জ শহরের রায়পুরে অবস্থিত জাতীয় জুট মিল। গত কয়েক বছর আগেই থেমে গেছে জাতীয় জুট মিল লিমিটেডের কার্যক্রম।
মিলটিতে এক সময় হাজারো শ্রমিক কাজ করলেও এখন সেখানে রয়েছে শুধু মরিচা ধরা যন্ত্রপাতি মেশিন। তবে মিল বন্ধ থাকলেও থামেনি খরচ। কারখানার কর্মকর্তা-শ্রমিকদের বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি মাসে সরকারকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা।
১৯৬০ সালে শহরের রায়পুরে প্রায় ৭৫ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই জুট মিল। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত এই জুট মিল পরে জাতীয়করণ হয়ে ‘জাতীয় জুট মিল’ নামে পরিচালিত হতে থাকে। দীর্ঘ সময় লাভজনকভাবে চললেও লোকসানের কারণ দেখিয়ে ২০০৭ সালে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
একসময় জেলার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল এই জুট মিলটি। হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পাটশিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল প্রতিষ্ঠানটি। গত দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগে মিলটি বারবার বন্ধ হয়ে যায়।
জানা যায়, বিশাল উৎপাদন ভবনগুলো ধীরে ধীরে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। কোথাও ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ছে, কোথাও ধুলায় ঢেকে আছে মেশিন। একসময় যে যন্ত্রগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে চলত, সেগুলোর অধিকাংশেই এখন মরিচা ধরেছে। কোটি কোটি টাকার যন্ত্রাংশ বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে।

জুট মিল সূত্রে জানা গেছে, এসব সম্পদ রক্ষায় এখনো কর্মরত আছেন ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে মাসে সরকারকে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা দিতে হচ্ছে।
শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালে মিলটি আবার চালু হয়। কিন্তু সেই স্বস্তিও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০২০ সালের ১ জুন আবারও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০২২ সালের আগস্টে কুষ্টিয়ার রশিদ গ্রুপ লিজ নিয়ে উৎপাদন শুরু করলেও দুই বছরের মাথায় অর্থাৎ ২০২৪ সালের আগস্টে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস বকেয়া রেখেই কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে মিলটি বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় শ্রমিক আলী হোসেন, রতন, শহিদুল, বুলবুল জানান, মিল বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে তাদের জীবনে। যাঁদের সংসার চলত এই প্রতিষ্ঠানের আয়ে, তাঁরা এখন নানা পেশায় ছড়িয়ে পড়েছেন। মিল চালু থাকলে সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় হতো। সংসার ভালোই চলত। মিল বন্ধ হওয়ার পর বাধ্য হয়ে ভ্যান চালাচ্ছি। পাশাপাশি সামান্য জমিতে কৃষিকাজ করে কোনোমতে সংসার জীবন পাড় করছি।
রহিমা খাতুন নামের আরেক শ্রমিক বলেন, এই মিলই ছিল পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। এখন বিভিন্ন কাজ করে কোনো রকমে সংসার চলছে। মিল আবার চালু হলে আমাদের মতো পুরোনো শ্রমিকদের কাজে নেওয়া হোক এটাই সরকারের কাছে দাবি।
সিরাজগঞ্জ স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম কমিটির সদস্য নব কুমার কর্মকার বলেন, জাতীয় জুট মিল চালুর দাবিতে আমরা বহুবার আন্দোলন করেছি। দলীয়করণ, দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণেই সম্ভাবনাময় এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান বারবার ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এতে হাজারো মানুষ কর্মহীন হয়েছেন।
জাতীয় জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন পরিচালিত এই মিলটি নতুন করে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
তিনি আরও বলেন, মিলটি বন্ধ থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। তাঁদের বেতন, বিদ্যুৎ বিলসহ প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান লিজ নিলেই উৎপাদন আবার শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।
পড়ুন : ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ৪ যানবাহনের সংঘর্ষে নিহত ২
সা/


