“বেশিরভাগ পাম্পেই গ্যাসের প্রেশার নাই। যেটায় একটু আছে সেখানে লম্বা লাইন, ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা লাগে। অনেক এলাকার পাম্পে তো গ্যাস নাই বলে বন্ধই করে রাখছে।”
বিবিসি বাংলাকে এভাবেই বলছিলেন ঢাকার নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা, প্রাইভেটকার চালক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন। সপ্তাহজুড়ে গ্যাস স্টেশনগুলোতে চরম ভোগান্তির কারণে আপাতত গাড়ি বের করাই বন্ধ রেখেছেন বলে জানান তিনি।
গ্যাস সংকটে চরম দুর্ভোগ বাসাবাড়িতেও। ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফজলে রাব্বি সৌরভ জানান, গ্যাস না থাকায় সপ্তাহজুড়ে রেস্টুরেন্টের খাবারই তার ভরসা।
“চারজন ব্যাচেলর বাসায় থাকি, রান্না করার জন্য লোক রাখা আছে। সারাদিন গ্যাস থাকে না, রাত ১২টার পর একটু আসে, তাও প্রেশার থাকে না। ওই সময় আবার রান্নার লোক আসতে পারবে না। চরম ভোগান্তিতে আছি, রেস্টুরেন্টই ভরসা,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
দুর্ভোগ চরমে ঢাকার মিরপুর ৬০ ফিট সড়ক সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা সুকন্যা আমীরের। ধারাবাহিক গ্যাস সংকটের কারণে রান্নার জন্য বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি।
“এমনিতেই এই এলাকায় গ্যাসের সমস্যা আছে। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে গ্যাস আসে না বললেই চলে। ইনডাকশনে রান্না করে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল দিচ্ছি আবার গ্যাস সংযোগ থাকায় সেখানেও বিল দিতে হচ্ছে,” বলেন মিজ আমীর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল ঢাকায়ই নয়, আশপাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীর অনেক এলাকায় গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না থাকায় সাভার ও গাজীপুরের শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।
দেশে মোট চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় এ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নতুন নয়। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক এলাকার পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সংকটের কারণ হিসেবে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে কারিগরি ত্রুটির কথা বলছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
গত বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে দুই-তিনদিনের মধ্যে সমস্যা সমাধানের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্যাস সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
এদিকে, এই সংকটের মধ্যেই সিএনজি বিক্রিতে কমিশন বাড়ানোর দাবিতে ধর্মঘটে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
শনিবার পেট্রোবাংলার সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠক হলেও কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় বাংলাদেশে গ্যাস সংকটের বিষয়টি নিয়মিত।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ সক্ষমতা সব মিলিয়ে দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
চাহিদার বাকি অংশের জোগান নিশ্চিত করা হয় বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে। এমন পরিস্থিতিতে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দেওয়ার কারণে মাঝেমধ্যেই সংকট চরম আকার ধারণ করে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, এবারও ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বা এফএসআরইউ এ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে।
বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ রয়েছে।
এক্সিলারেট এনার্জি এবং সামিট গ্রুপ পরিচালিত এই টার্মিনালগুলোর মাধ্যমেই বিদেশ থেকে আনা এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন বা রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
যার একটিতে ত্রুটি হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শুরুতে এই সংকটকে সাময়িক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ত্রুটি চিহ্নিত করতে সময় বেশি লাগার কারণেই প্রেক্ষাপট জটিল হয়েছে।
এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে ঠিক কত সময় লাগতে পারে সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেননি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
পড়ুন : এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি, তিতাস এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট


