বিজ্ঞাপন

প্রবীণ স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের বৈশ্বিক মডেল নির্মাতা সাবেক স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান

বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনায় আমরা প্রায়ই অবকাঠামো, বাজেট বা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে বেশি মনোযোগ দিই। কিন্তু জনসেবার প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করে সমাজের সেই মানুষদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ওপর, যাদেরকে আমরা প্রায়ই অদৃশ্য করে রাখি। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সাবেক সচিব মো. সাইদুর রহমান সেই অদৃশ্য মানুষদেরই দৃশ্যমান করেছেন দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি কার্যকর প্রবীন স্বাস্থ্য ও প্রবীন যত্ন ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্টার মাধ্যমে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্পষ্ট প্রবীণরা শুধু চিকিৎসার অধিকারী নন, তাঁরা মর্যাদা, সহানুভূতি এবং মানবিক যত্নের অধিকারী।

বিজ্ঞাপন

চলনবিলের জলবেষ্টিত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে দীর্ঘদিন সিভিল সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে একটি মৌলিক উপলব্ধি দেয়, গ্রামের একজন প্রবীণ মানুষের জন্য প্রেসক্রিপশন যথেষ্ট নয়, তাঁর প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা যা তাঁর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক মর্যাদাকে সমুন্নত রাখে। এই উপলব্ধিই তাঁকে প্রবীণ পরিচর্যার একটি প্রাতিষ্ঠানিক মডেল নির্মাণে অনুপ্রাণিত করে, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

সাবেক স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমানের উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রবীণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো শুধু চিকিৎসা নয়, বরং একটি সমন্বিত মানবিক সেবা কাঠামো। এখানে অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনা, মানসিক সমর্থন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং গৃহভিত্তিক পরিচর্যা একত্রে প্রদান করা হয়। বিশেষ করে চলন বিলের মতো দুর্গম অঞ্চলে এই মডেল বাস্তবায়ন করে তিনি দেখিয়েছেন, সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে গ্রামীণ এলাকায়ও বিশ্বমানের প্রবীণ পরিচর্যা সম্ভব।
এই মডেলের সাফল্য আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রতিনিধির নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদল উদ্যোগকে অসাধারণ প্রচেষ্টা এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাঁদের মতে, প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক সিলভার সুনামি মোকাবিলায় এই মডেলটি গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে বারবার প্রয়োগযোগ্য। বিশেষ করে দুর্গম গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে বিশেষায়িত প্রবীণ স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি সফল উদাহরণ।

প্রবীণ পরিচর্যার এই মডেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এখানে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্য সেবাদানকর্মী তৈরি করা হচ্ছে, যারা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার মূল স্তম্ভকে শক্তিশালী করছে। তাঁদের বহুমুখী কারিগরি দক্ষতা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত দুর্ভাবনা কমাচ্ছে এবং প্রবীণদের মর্যাদার সঙ্গে বৃদ্ধ হওয়ার অধিকারকে আরও সুসংহত করছে। এই প্রশিক্ষিত জনবল ভবিষ্যতে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
জেরিয়াট্রিক্সের প্রবর্তক ড. ইগনাশিয়াস লিও ন্যাশার ১৯০৯ সালে দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস এ এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন বার্ধক্যের নিজস্ব একটি স্বকীয়তা রয়েছে যা শৈশবের মতোই স্পষ্ট, এর রোগ ও চিকিৎসা পরিপক্ব বয়স থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও প্রবীণ স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। সাইদুর রহমানের মডেল সেই দৃষ্টিভঙ্গিকেই বাস্তব রূপ দিয়েছে বাংলাদেশের গ্রাম থেকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য চর্চার মঞ্চ পর্যন্ত।

সরকারি দায়িত্ব শেষ হলেও মাঠ পরিদর্শন, সহানুভূতিশীল সেবা এবং প্রবীণদের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার আজও অটুট। তাঁর কাজ জাতীয় চেতনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। চলনবিলের এক কোণের একজন বাবা বা দাদু আজ রাজধানীর একজন বাসিন্দার মতো একই মানের স্বাস্থ্যসেবার পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, এটাই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব রূপ।

তিনি শুধু একটি স্বাস্থ্যসেবা মডেল নির্মাণ করেননি, তিনি মানবিকতার এক উত্তরাধিকার গড়ে তুলেছেন, যা আজ বিশ্ব দেখছে এবং অনুসরণ করছে।
বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই মডেল শুধু একটি স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগ নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। এটি দেখিয়েছে বার্ধক্য কোনো বোঝা নয়, বরং জীবনের একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়, যা মর্যাদা ও যত্নের দাবি রাখে।

চলনবিলের সন্তান সাইদুর রহমান সেই দাবি পূরণের পথ দেখিয়েছেন। তাঁর নির্মিত মডেল ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও মানবিক, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আরও ন্যায়ভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এটিই আমাদের চরম প্রাপ্তী ও প্রত্যাশার সম্মিলন।

পড়ুন:সোনারহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘মাদক ও মানব পাচারকে না বলুন’ শীর্ষক সচেতনতামূলক আলোচনা সভা

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন