প্রতি বছর ২৮শে জুলাই বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস পালিত হয়। দিনটির মূল লক্ষ্য প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
তবে প্রকৃতি সংরক্ষণের এই দিনে দেশের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগই বেশি। জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, নদীদূষণ, প্লাস্টিকের আগ্রাসন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য দিন দিন নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর।
গণমাধ্যম সূত্র বলছে, বিশেষ করে দেশের উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনও এখন বড় হুমকির মুখে। কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপে বাগদা চিংড়ির ঘের তৈরির জন্য নদীর তীর ঘেঁষে বাঁধ নির্মাণ, স্লুইস গেট বসানো এবং লবণাক্ত পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব ঘের তৈরির জন্য দ্বীপটির উত্তর-দক্ষিণ অংশজুড়ে বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ বন কেটে ফেলা হচ্ছে। কোথাও পুরোনো গাছ কেটে পরিষ্কার করা হয়েছে, আবার কোথাও সদ্য কাটা গাছ পোড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। স্যাটেলাইট চিত্র ও ড্রোন ফুটেজেও এই বন ধ্বংসের ব্যাপক চিত্র উঠে এসেছে।
পরিবেশবিদদের মতে, ম্যানগ্রোভ বন শুধু উপকূলের সৌন্দর্যই নয়, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি এটি অসংখ্য মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। এই বন ধ্বংস হলে উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশ দুটিই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
গণমাধ্যম সূত্রের মতে, এদিকে পরিবেশবিদদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ। সংরক্ষিত শালবনের মাঝখানে এমন স্থাপনা গড়ে উঠলে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর জন্য বড় হুমকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভাওয়ালের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, গৃহস্থালি আবর্জনা, প্লাস্টিক ও অন্যান্য ক্ষতিকর বর্জ্য নিয়মিত সেখানে ফেলা হলে বাতাস, মাটি ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হবে।
প্রায় ৫ হাজার হেক্টর শালবনজুড়ে বিস্তৃত ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান হরিণ, বুনো শূকর, বেজি, নানা প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। একই সঙ্গে এই বন কার্বন শোষণ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা এবং ঢাকার আশপাশের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে শুধু ভাওয়াল নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকাতেই বন উজাড়ের ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন—নিয়মিত গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় রোধ করা, কাছের পথে হাঁটা বা সাইকেল ব্যবহার করা, নদী-খাল ও জলাশয়ে ময়লা না ফেলা, বন্যপ্রাণী রক্ষা করা এবং শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতি রক্ষা শুধু সরকার বা পরিবেশবাদী সংগঠনের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব। গাছ লাগানো, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় রোধ, নদী-খাল পরিষ্কার রাখা, বন্যপ্রাণী রক্ষা এবং শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করে তোলার মাধ্যমে প্রকৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ পৃথিবী উপহার দেওয়া। তাই শুধু একটি দিবস পালন নয়, প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন উদ্যোগই হতে পারে প্রকৃতি সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় শক্তি।
পড়ুন : প্রথমবারের মতো বঙ্গভবনে অফিস করবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি
সা/


