স্বৈরাচারী শাসনের কবল থেকে দেশ মুক্ত হওয়ার পর জুলাইয়ের কৃতিত্ব নিয়ে বিভাজন তৈরি না করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের একার অর্জন নয়। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, নির্যাতন, গুম-খুন ও আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় এই গণ–অভ্যুত্থান সফল হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘সে রকম একটা স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্তির পরে আমরা যদি বলি, জুলাই কার, জুলাই কার, তাহলে জুলাই আমাদের কারোরই থাকবে না। এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে।’
আজ বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, পৃথিবীতে অনেক জাতি স্বাধীনতার জন্য শত বছর সংগ্রাম করেও স্বাধীনতা পায়নি। কোনো কোনো সময় অল্প কয়েকটি দিন বা সপ্তাহের মধ্যে শতাব্দীর পরিবর্তন ঘটে যায়। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানও তেমন একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন। তাই এ অর্জনকে দলীয়করণ না করে এর মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
আয়নাঘরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেখানে ২৪ ঘণ্টাও স্বাভাবিকভাবে থাকা সম্ভব নয়। প্রয়াত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর সঙ্গে কারাগারে থাকার অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মীর কাসেম আলী তাঁকে বলেছিলেন, দেশে না ফিরলে তাঁর ছেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেও গ্রেপ্তার হন এবং তাঁর ছেলেকেও আটক করা হয়। এ ঘটনাকে তিনি স্বৈরাচারী শাসনের ‘জ্বলন্ত ইতিহাস’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পর জুলাইয়ের কৃতিত্ব নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বিভাজন না করার আহ্বান জানান গুমের শিকার হওয়া সালাউদ্দিন আহমদ। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পরিক্রমার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি কোনো এক দিনের আন্দোলন নয়। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বিরোধী দল ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা হত্যা, গুম, হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন।
বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি বহু পরিবার স্বজন হারিয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইলিয়াস আলীর মতো অনেকে গুম হয়ে আর ফেরেননি। এসব ত্যাগ বাদ দিয়ে শুধু জুলাইয়ের ৩৬ দিনকে দেখলে আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস জানা যাবে না। তিনি বলেন, কোনো আন্দোলন অহিংস না সহিংস হবে, তা সাধারণ মানুষ বা কোনো ব্যক্তি ঠিক করে না। আন্দোলনকে যখন নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পথে চলতে দেওয়া হয় না, তখন সেটি সহিংস ও রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের কারণে জুলাইয়ের আন্দোলন রক্তাক্ত হয়েছে।
জুলাইয়ের আন্দোলনের পেছনে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগের কথাও উল্লেখ করেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় খালেদা জিয়া ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সন্তান হারিয়েছেন এবং চিকিৎসার সুযোগ না নিয়েও আপসহীন অবস্থানে থেকেছেন।
জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণভোটের রায় ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোকে একসঙ্গে বসতে হবে। সংশোধন কমিটিতে অংশ নিতে তিনি দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংস্কার পরিষদ বা জাতীয় সংস্কার পরিষদ; নাম যা–ই দেওয়া হোক, বাস্তবে সংস্কার কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংসদে সংশোধনী গ্রহণের মাধ্যমেই সংস্কারের বাস্তবায়ন সম্ভব। প্রতিটি সংশোধনীই একেকটি সংস্কার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন একটি সংবিধান সংশোধনী আনার কথা বলেন, যা দীর্ঘদিন দেশ পরিচালনার ভিত্তি হতে পারে। কারণ ১৯৭১ বা জুলাইয়ের মতো গণ–অভ্যুত্থান বারবার আসে না। গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বর্তমান প্রজন্মকে দায়ী করবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
পড়ুন : জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে কুড়িগ্রামে ১১ দলের গণমিছিল


