বিজ্ঞাপন

ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ আসলে কী নিয়ে?

গত দুই দিনে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অন্তত চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে, যার ফলে দুটি ছাত্র সংগঠনে সব মিলিয়ে অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এসব হামলায় রড, লাঠি, রামদাসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রেরও ব্যবহার হতে দেখা গেছে।

মঙ্গলবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনাটি শুধু ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার পর সেখানে ঢুকে পাল্টা হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিবিরের ভিপি ও জিএসসহ শিবির নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে শিবির।

পরপর দুই দিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসব হামলা, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের পেছনে দুটি ছাত্র সংগঠনই একে অপরকে দায়ী করেছে।

ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব অভিযোগ করেছেন, “প্রথমে শিবিরই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাকি ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদল শিবিরকে প্রতিহত করেছে”।

যদিও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দামের দাবি, দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদলের তেমন কোনো শক্ত অবস্থান নেই, ক্যাম্পাসগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতেই তারা শিবিরের ওপর এই হামলা চালিয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও এবার পরপর দুইদিনে অন্তত চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলো।

রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটে গত সোমবার। সেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে ছাত্রশিবির একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা স্মারক মাঠে ওই অনুষ্ঠানস্থলে বিভিন্ন ব্যানার ফেস্টুনের গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ শাসনামলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রচার করছিল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির।

সেখানে একটি ফেস্টুনে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ছবি প্রদর্শনকে ঘিরে বিকেলে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়।

এক পর্যায়ে উভয়পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীও আহত হন।

পরদিন মঙ্গলবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানেও সংঘাত তৈরি হয়।

অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের উদ্যোগে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেরানীগঞ্জে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাসদস্যদের কাছে হস্তান্তর, অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মেডিক্যাল সেন্টারের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিভিন্ন দাবি লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে অডিটোরিয়ামে প্রবেশের চেষ্টা করেন।

এসব প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনে ছাত্রদল বাধা দিলে এতে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও সংঘর্ষ শুরু হয়। সে সময় শিবির প্যানেল থেকে নির্বাচিত জকসু নেতা ও ছাত্র শিবির নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রদলের কর্মীরা বের করে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে।

পরে দুপুর ২টার দিকে আহতদের খোঁজ নিতে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে গেলে সেখানেও হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। হাসপাতালের ভেতরেও ভাংচুর চালাতে দেখা যায়।

এরপর সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে পুলিশের পাহারায় ন্যাশনাল মেডিকেলে চিকিৎসাধীন শিবির ও ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের অ্যাম্বুলেন্সে করে সরিয়ে নেওয়া হয়।

এ দিন বিকেলে পুরান ঢাকার বকশিবাজার এলাকায় অবস্থিত ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

দুই পক্ষের এই সংঘর্ষের সময় লাঠিসোটা হাতে নিয়ে কয়েকজনকে মারধর করতে দেখা যায়। এই সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার সময় বেশ কয়েকজন আহত হন এবং সেখানে ভাঙচুরও চালাতে দেখা যায়।

একই দিন বিকেলে ঢাকা কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। এসময় নিউমার্কেট এলাকায় দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে।

এসব ঘটনার পরপরই বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রশিবির। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দেয় জামায়াতে ইসলামীও।

চারটি বড় ক্যাম্পাসে সংঘাত নিয়ে একে অপরের দায়ী করেছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরই প্রথম হামলা চালিয়েছে ছাত্রদলের ওপর। এই ক্যাম্পাসে শিবির তাদের অতীত সন্ত্রাসী কার্যক্রমের রাজনীতির প্রদর্শন করেছে”।

ছাত্রদলের দাবি, মূলত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার পরই অন্য ক্যাম্পাসে তার জবাব দিয়েছে ছাত্রদল।

মি. রাকিব বলছিলেন, “বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রদলের ওপর হামলা চালাতে চেয়েছিল শিবির। পরে ছাত্রদল তা প্রতিহত করেছে”।

ছাত্রদলের এই নেতার দাবি, একই কায়দায় ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায়ও শিবির প্রথম হামলা চালানোর পর ছাত্রদল তার জবাব দিয়েছে।

এদিকে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের হামলার প্রতিবাদে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বুধবার গণজমায়েত করেছে ছাত্রশিবির। সেখান থেকে এই হামলার ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়।

শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরকে প্রতিহত করতে গিয়ে তারা (ছাত্রদল) ব্যাকফুটে চলে গেছে। সেই ব্যর্থতা ঢাকতে গিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য ক্যাম্পাসেও হামলা চালিয়েছে”।

ছাত্র শিবিরের দাবি, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পর একই দিনে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে হামলার ঘটনা ঘটেছে সেগুলো করা হয়েছে তার সবগুলোই ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

মি. সাদ্দাম বলছিলেন, “গত কয়েকদিন ক্যাম্পাসে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে সেগুলো একেবারেই ইন্টেনশনালি। বহিরাগত সন্ত্রাসী দিয়ে আধিপত্য বিস্তারকে সামনে রেখেই এই হামলা করা হচ্ছে”।

শিবিরের সভাপতির দাবি, “দেশের বেশিরভাগ ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের তেমন কোনো অবস্থান নেই। যে কারণে তারা এই ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ছাত্রদল ক্যাম্পাসগুলোতে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে”।

এছাড়াও দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সরকারের যে সমালোচনা চলছে সেটিকে আড়াল করতে ছাত্রশিবিরের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন শিবির সভাপতি।

বিজ্ঞাপন

সূত্র : বিবিসি বাংলা

পড়ুন : ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন