বিজ্ঞাপন

মক্কায় প্রতিরক্ষা চুক্তি, বদলে যেতে পারে আঞ্চলিক সমীকরণ

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান শুক্রবার মক্কায় একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে। ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই সমঝোতার মাধ্যমে গত বছর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে হওয়া একই ধরনের চুক্তির পরিধি আরও বিস্তৃত হলো।

বিজ্ঞাপন

চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইসরায়েল ও ইরানের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা দেশগুলোর এই জোট ভবিষ্যতে আরও বড় আঞ্চলিক জোটের ভিত্তি হতে পারে।

তবে চুক্তিটি বাস্তবে কতটা কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, কিংবা কোনো একটি সদস্য দেশ সংঘাতে জড়ালে অন্য দুই দেশ কী মাত্রায় সামরিক সহায়তা দেবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান কিলোয়েন গ্রুপের চেয়ারম্যান হারলান উলম্যান আলজাজিরাকে বলেন, তারা এখনো মক্কা ঘোষণাটি দেখেননি। তবে তার ধারণা, এতে কোনো একটি দেশের ওপর হামলাকে বাকি সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা থাকতে পারে। তার মতে, এখানে ‘উচিত’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর অর্থ এমন নয় যে হামলা হলেই অন্য দেশগুলো নিশ্চিতভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।

সামনে রয়েছে আঞ্চলিক নানা নিরাপত্তা ঝুঁকি

তিন দেশের জন্য আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি অবশ্য নতুন কিছু নয়। পাকিস্তান গত ফেব্রুয়ারি থেকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে জড়িত। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে আরেক পরমাণু শক্তিধর দেশ ভারতের সঙ্গেও কয়েক দিন ধরে সংঘর্ষে জড়িয়েছিল দেশটি।

অন্যদিকে, গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরব একাধিকবার ইরান ও তাদের মিত্রদের হামলার মুখে পড়েছে।

তুরস্কও দীর্ঘদিন ধরে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির উত্তেজনাও বেড়েছে।

হারলান উলম্যানের মতো বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তিন ধরনের সংঘাতের কোনো একটিতে মক্কা চুক্তির তিন সদস্য দেশকে একসঙ্গে টেনে আনা হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ইয়েমেনের হুতিরা যদি সৌদি আরবে হামলা চালায়, তাহলে তুরস্ক কি এতে জড়াবে? পাকিস্তানই বা জড়াবে কি না—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আঞ্চলিক রাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা এবং পরবর্তী সময়ে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

ইরান ও ইসরায়েলের কয়েক দশকের পারস্পরিক হুমকি-ধামকি শেষ পর্যন্ত একটি অনির্দিষ্ট আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার পথ খুঁজছে।

পারস্পরিক হুমকির মুখে অনেক দেশই পুরোনো মতপার্থক্য পাশে রেখে বাস্তবসম্মত পথে এগোনোকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তুরস্ক ও সৌদি আরব এর বড় উদাহরণ।

২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার পর দুই দেশের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি ঘটে, যা কয়েক বছর স্থায়ী হয়। তবে ২০২২ সালের মধ্যে রিয়াদ ও আঙ্কারা পুরোনো বিভেদ কাটিয়ে সম্পর্ক উন্নয়নের পথে এগোয়। সৌদি আরব পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা কমানোর কৌশল নেয়, অন্যদিকে তুরস্ক গুরুত্ব দেয় নিজের অর্থনীতি শক্তিশালী করার দিকে।

এরপর থেকে ইসরায়েল ও ইরান—দুই দেশই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক রূপরেখা বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টি করে আসছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই পরিস্থিতিই পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো দেশগুলোকে আরও কাছাকাছি এনেছে।

নতুন প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো তিন দেশের ওপর আসা যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা।

আলজাজিরার প্রতিনিধি উসামা বিন জাভেদের মতে, জোটের প্রতিটি দেশই তাদের নিজস্ব সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে এসেছে। তিন দেশের প্রত্যেকেরই রয়েছে আলাদা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের রয়েছে অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী, বড় অস্ত্রভাণ্ডার এবং মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে বিশেষ সক্ষমতা। ন্যাটো সদস্য তুরস্কের রয়েছে উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা উৎপাদন শিল্প। আর সৌদি আরবের রয়েছে এই ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক রসদ জোগানোর সক্ষমতা।

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি ও তার ওপর নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় মূলত নতুন এই সামরিক জোট ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। সৌদি আরবের পাশাপাশি তুরস্কও দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করেছে।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি যত অনিয়মিত ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ততই বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান অগ্রাধিকার এখন ইসরায়েলকে ঘিরে। ফলে অন্য মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটন কতটা আগ্রহী, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

উলম্যান বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে মিত্রদের নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে। তার মতে, এর ফলে পুরোনো মিত্ররা এখন বিকল্প পথ খুঁজছে।

ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ

ইসরায়েল ও ইরান—দুই দেশকেই আঞ্চলিক বড় হুমকি হিসেবে দেখা হলেও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী তিন দেশ তাদের নতুন জোটকে কোনো নির্দিষ্ট বাহ্যিক শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়নি।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েল ও ইরান থেকে আসা নিরাপত্তা ঝুঁকি স্পষ্ট।

উসামা বিন জাভেদ বলেন, তিন দেশের জন্যই ইসরায়েল আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় হুমকি। এরপরই রয়েছে ইরান, বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য।

অনেকের মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা ইসরায়েল ২০২৩ সালের পর দেখিয়েছে যে তারা আলোচনার তুলনায় সামরিক শক্তি প্রয়োগে বেশি আগ্রহী। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও সম্প্রতি একটি সম্ভাব্য ‘সুন্নি অক্ষ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। যদিও তিনি এর কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা দেননি।

বিশ্লেষকদের যুক্তি, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যই উল্টো প্রধান সুন্নি-সংখ্যাগরিষ্ঠ শক্তিগুলোকে একই ছাতার নিচে আসার জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক—তিন দেশই সুন্নি-সংখ্যাগরিষ্ঠ।

অন্যদিকে, ইরান ও তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এরই মধ্যে সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে সৌদি আরব ইরাকে অবস্থানরত ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

আরও দেশ কি যুক্ত হবে?

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পর এখন প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে এর সঙ্গে আরও দেশ যুক্ত হবে কি না। সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে মিসর, কাতার, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম আলোচনায় রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ইস্যুতে বিভক্ত। পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করেন, এই বিভক্তির কারণেই ইসরায়েল ও ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তির মোকাবিলায় তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি।

তবে নতুন জোটে অন্য দেশগুলোর যোগ দেওয়ার বিষয়টি সহজ হবে না। পুরোনো মতপার্থক্য ও জাতীয় স্বার্থের ভিন্নতার কারণে অনেক দেশই এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিতে পারে।

সিরিয়া ১৩ বছরের যুদ্ধের পর বর্তমানে পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে। ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তে অবস্থানের কারণে এমন কোনো জোটে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে দেশটি সতর্ক হতে পারে।

মিসরও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এড়ানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অতীতে আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সৌদি নেতৃত্বাধীন সমুদ্রপথের নিরাপত্তা জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও দেশটি দ্বিধায় ছিল।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও সম্ভাব্য সদস্য হতে পারে। তবে ইয়েমেনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে দেশটির অবস্থানগত পার্থক্য দেখা গেছে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রেও আমিরাত আলাদা পথ বেছে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ‘আব্রাহাম আকর্ডস’-এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এই জোট মক্কা জোটের একটি বড় প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ হয়ে উঠতে পারে।

মক্কা চুক্তির পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি শক্তির অক্ষ তৈরি হচ্ছে—এমন আলোচনা শুরু হলেও এখনই বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা কঠিন। এ অঞ্চলে জোট ও অংশীদারত্বের সমীকরণ কয়েক দশক ধরেই পরিবর্তনশীল।

চুক্তিটির প্রকৃত কার্যকারিতা বোঝা যাবে তখনই, যখন তিন দেশের কোনো একটি বাস্তব নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়বে। ইসরায়েল ও ইরান ইতোমধ্যে প্রয়োজন হলে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি দেখিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানও কি একে অপরের জন্য একই ধরনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন কোনো সংকট তৈরি হলে তিন দেশকেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, মক্কা চুক্তির মাধ্যমে সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো আঞ্চলিক শক্তির অক্ষ তৈরি হচ্ছে কি না।

লেখক: আলজাজিরার একজন সম্পাদক। তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা ডেস্কে কাজ করেন এবং সংবাদ, ফিচার ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন লেখা ও সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত।

পড়ুন: কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন