বিজ্ঞাপন

লিবিয়া থেকে ফিরে : নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিল মাদারীপুরের দুই যুবক

ইতালির স্বপ্নটা ছিল খুব সাধারণ বিদেশে গিয়ে একটা ভালো চাকরি করবেন, সংসারের অভাব ঘুচাবেন, বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবেন। সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে মাদারীপুরের রাহাত তালুকদার ও আরাফাত কাজীর পরিবার বিক্রি করেছে জমিজমা, নিয়েছে ঋণ, এমনকি শেষ সম্বলটুকুও তুলে দিয়েছে দালালদের হাতে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ইউরোপের ইতালির বদলে তাদের যাত্রা থামে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায়। সেখানে একের পর এক হাতবদল হয়ে তারা পৌঁছান কথিত ‘গেমঘরে’। এরপর স্বপ্নের জায়গা নেয় ভয়, আতঙ্ক আর নির্যাতন।

হাত-পা বেঁধে মারধর, মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে চিৎকার বন্ধ করা, প্লাস্টিক ও লোহার পাইপ দিয়ে পেটানো, সিগারেটের আগুনে শরীর পোড়ানো, গরম লোহা দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার মতো নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন দেশে ফিরে আসা দুই যুবক।

তাদের অভিযোগ, নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে পরিবারের কাছে পাঠানো হতো। এরপর সেই ভিডিও দেখিয়ে দাবি করা হতো লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ। রবিবার (০৯ আগস্ট)  সকালে সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে শোনা যায় এই  নির্যাতনের গল্প।

প্রায় এক বছর পর গত ৮ আগস্ট দেশে ফিরেছেন  রাহাত তালুকদার(২৮) ও আরাফাত কাজী(২৫) বর্তমানে তারা মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। শরীরের ক্ষত শুকাতে শুরু করলেও লিবিয়ার সেই বন্দিজীবনের ক্ষত এখনো শুকায়নি মনে।

‘মারার আগে হাত-পা বেঁধে ফেলত’

হাসপাতালের শয্যায় বসে রাহাত তালুকদার যখন লিবিয়ার সেই দিনগুলোর কথা বলছিলেন, তখনও তার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ।

রাহাত বলেন, “প্রতিদিন পালা করে তিন বেলা মারধর করত। মারার আগে হাত-পা বেঁধে ফেলত। মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে দিত, যাতে চিৎকার করতে না পারি। কখনো প্লাস্টিকের পাইপ, আবার কখনো লোহার পাইপ দিয়ে পেটাত।”

তার অভিযোগ, “সিগারেটের আগুন দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গা পুড়িয়ে দিত। এমনকি হাতের নখও তুলে ফেলেছে।”

নির্যাতনের সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে কিছুক্ষণ নীরব থাকেন রাহাত। এরপর বলেন, “বাড়িতে ফোন দিয়ে টাকা দিতে বলত। টাকা না দিলে নির্যাতন আরও বাড়িয়ে দিত। একবেলা খাবার দিত। একটা ঘরে ৪০০ থেকে ৫০০ জনের মতো মানুষকে আটকে রাখা হতো। দিন-রাতের হিসাবই ভুলে গিয়েছিলাম।”

নির্যাতনের কারণে এখনো অনেক ঘটনা ঠিকমতো মনে করতে পারেন না তিনি।
রাহাত বলেন, “অনেক কিছুই এখন ঠিকমতো মনে করতে পারি না। তারপরও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, আমরা জীবিত দেশে ফিরতে পেরেছি।”

ইতালির স্বপ্নের শুরু, লিবিয়ায় গিয়ে সর্বনাশ

রাহাতের পরিবারের দাবি, ২০২৫ সালের মার্চের দিকে স্থানীয় কয়েকজন দালাল বাড়িতে এসে তাকে ইতালিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। বলা হয়, ইতালিতে গেলে ভালো বেতনের চাকরি হবে। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও বদলে যাবে।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মজিবর শেখ, শামসু ফকির ও মাহাবুব মুন্সির মাধ্যমে মূল দালাল সুমনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। প্রথমে প্রায় ২২ লাখ টাকার বিনিময়ে ইতালি পাঠানোর কথা হয়।পরে মাফিয়ার কাছে বিক্রি করে দেওয়ার পরে দেওয়া হয় আরো ২৫ লাখ।

ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে সেই টাকা জোগাড় করতে পরিবারের শেষ সম্বল পর্যন্ত বিক্রি করতে হয় বলে জানান স্বজনরা।

রাহাত বলেন, “আমরা বিশ্বাস করেছিলাম ইতালিতে যাব। ভালো কাজ করব, পরিবারকে টাকা পাঠাব। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর বুঝতে পারি, আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।

পরিবারের অভিযোগ, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর রাহাতকে একটি সশস্ত্র চক্রের কাছে তুলে দেওয়া দালাল সুমন বেপারী। এরপর তাকে অন্য একটি চক্রের কাছে বিক্রি করা হয়। একপর্যায়ে তাকে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন কথিত ‘গেমঘরে’ আটকে রাখা হয়।

সেখান থেকেই শুরু হয় নির্যাতন ও মুক্তিপণের দাবির নতুন অধ্যায়।
পরিবারের দাবি, রাহাতের নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে আরও প্রায় ২৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে।

ছেলের ভিডিও দেখে মনে হয়েছে বুকটা কেউ ছিঁড়ে ফেলছে

রাহাতের মা মায়া বেগমের কাছে ছেলেকে বিদেশে পাঠানো ছিল সংসারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নই একসময় তার জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি বলেন, ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করবে, সংসারের হাল ধরবে এই আশা নিয়েই বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। পরে জানতে পারি, ইতালিতে নয়, লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে তাকে আটকে রাখা হয়েছে। কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন মায়া বেগম।

তিনি বলেন, ছেলের নির্যাতনের ভিডিও যখন দেখেছি, তখন মনে হয়েছে আমার বুকের ভেতরটা কেউ ছিঁড়ে ফেলছে। ওকে বাঁচানোর জন্য যা ছিল সব দিয়েছি। ধার করেছি, মানুষের কাছে হাত পেতেছি। অনেক দিন পর্যন্ত জানতাম না আমার ছেলে বেঁচে আছে কি না।”অবশেষে আমার ছেলেকে আমি কাছে পেয়েছি আল্লাহর কাছে লাখো শুকরিয়া।

তার আকুতি, আমি শুধু চাই, যারা আমার ছেলেসহ অন্যদের এই অবস্থায় ফেলেছে, তাদের বিচার হোক। আর কোনো মা যেন এভাবে সন্তানের জন্য অপেক্ষা না করেন।

রাহাতের দুলাভাই জামাল মাতুব্বর বলেন, “নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে একের পর এক টাকা দাবি করা হয়েছে। পরিবারের সবাই মিলে টাকা জোগাড় করেছি। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় রাহাতের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো তাকে আর জীবিত পাব না। রাহাত আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে কিন্তু আমরা এই দালালের বিচার চাই।

আরাফাতের শরীরেও নির্যাতনের দাগ

রাহাতের মতোই আরাফাত কাজীর গল্পও ইতালির স্বপ্ন দিয়ে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে লিবিয়ার বন্দিশালায়।

আরাফাত বলেন, আমাদের সঙ্গে যারা ছিল, তারা বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছিল। সবারই স্বপ্ন ছিল ইতালিতে যাওয়ার। কিন্তু সেখানে গিয়ে বুঝলাম আমরা বন্দি।

তার ভাষ্য, হাত-পা বেঁধে মারধর করত। মুখে টেপ লাগিয়ে দিত। চিৎকার করলেও কেউ শুনতে পেত না। বাড়িতে ফোন দিয়ে টাকা আনতে বলত। টাকা না এলে আবার নির্যাতন করত।

আরাফাতের অভিযোগ, তাকে বায়ু পথে নির্যাতন করা হয়েছে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম লোহা দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এখনো শরীরে সেই ছ্যাকার দাগ আছে। পায়ের তলা পিটিয়ে ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখনো খালি পায়ে হাঁটতে পারি না। পায়ে ব্যথা করে, হাঁটলে জ্বালা করে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা আরাফাতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের চিহ্ন এখনো দেখা যায় বলে জানান স্বজনরা।

‘জমি বিক্রি, ঋণ—সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা’

আরাফাতের বড় ভাই মাহাবুব কাজী বলেন, ভাইকে বাঁচাতে তাদের পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছে।

তিনি বলেন, জমিজমা বিক্রি করেছি, ঘরবাড়ির জন্য ঋণ করেছি। সব মিলিয়ে দালাল সুমন বেপারীকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা দিয়েছি। স্থানীয় তিন দালাল—মাহাবুব মুন্সি, শামসু ফকির ও মজিবর শেখের মাধ্যমে এসব টাকা দেওয়া হয়েছে।

মাহাবুবের অভিযোগ, এত টাকা দেওয়ার পরও ভাইকে ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না। আজ আমরা আমার ভাইরে ফিরে পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। আমরা প্রতারণার বিচার চাই। যারা টাকা নিয়েছে, তাদের আইনের আওতায় এনে আমাদের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা হোক।

একই গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবারের একই গল্প

মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদী ইউনিয়নের পূর্ব টুবিয়া গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশে যাওয়ার নামে লিবিয়ায় পাচারের শিকার হয়েছেন এমন পরিবারের সংখ্যা কম নয়।

স্থানীয়দের দাবি, গ্রামের অর্ধশতাধিক যুবক কোনো না কোনোভাবে বিদেশে পাঠানোর নামে দালালচক্রের ফাঁদে পড়েছেন।

কারও ছেলে নিখোঁজ, কারও ভাই বন্দি, আবার কেউ মুক্তিপণ দেওয়ার পরও স্বজনের সন্ধান পাননি।

এলাকাবাসী জুবায়ের তালুকদার, মহাসিন তালুকদার ও সিয়াম তালুকদার বলেন, দালালরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিদেশে ভালো চাকরি ও উন্নত জীবনের কথা বলত। তাদের কথা বিশ্বাস করে মানুষ জমি বিক্রি করেছে, ঋণ করেছে। এখন অনেক পরিবার নিঃস্ব।

তারা বলেন, শুধু স্থানীয় দালালদের ধরলে হবে না। এই চক্রের পেছনে থাকা মূল হোতাদেরও খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা আসাদ ও সুজন বলেন, বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নকে কাজে লাগিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা ছাড়া এ ধরনের পাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়।

মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

স্বপ্নের আড়ালে ভয়ংকর এক বাণিজ্য

রাহাত ও আরাফাতের গল্প শুধু দুই যুবকের বন্দিজীবনের গল্প নয়। এটি বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি ভয়ংকর বাণিজ্যেরও প্রতিচ্ছবি।

একটি ভালো চাকরি, একটু স্বচ্ছল জীবন আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন তারা। সেই স্বপ্নই তাদের নিয়ে যায় এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষকে পণ্যের মতো এক চক্রের হাত থেকে আরেক চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

তারা ফিরে এসেছেন। কিন্তু তাদের মতো আরও কত যুবক এখনো লিবিয়ার অন্ধকার বন্দিশালায় আটকে আছেন তার সঠিক হিসাব নেই।

পূর্ব টুবিয়ার ঘরে ঘরে তাই এখনো অপেক্ষা। কারও অপেক্ষা নিখোঁজ ছেলের জন্য, কারও ভাইয়ের জন্য, কারও স্বামীর জন্য।

রাহাত ও আরাফাতের দেশে ফেরার খবর সেই অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর জন্য কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে।

পড়ুন : জামায়াত জোটের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী কর্নেল অলি

সা/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন