বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নিসচার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার আশ্বাস সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রীর

সড়ক দুর্ঘটনা রোধ, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথের নিরাপত্তা জোরদারে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এমপি।

বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর নিসচার একটি প্রতিনিধি দল মন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে দীর্ঘ ৩৩ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সংগঠনটির বিভিন্ন কার্যক্রম, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে এবং নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ১৫ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা মন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হয়।

নিসচা প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সংগঠনের মহাসচিব লিটন এরশাদ। প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন বাবুল, ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার সরকার মোঃ রাশেদুল হাসান (ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল), ভাইস চেয়ারম্যান এস এম আজাদ হোসেন, দপ্তর সম্পাদক ফিরোজ আলম মিলন, যুগ্ম মহাসচিব মোঃ কাইয়ুম খান, দুর্ঘটনা অনুসন্ধান ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক ড. প্রফেসর মাহবুব আলম তালুকদার, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আব্দুর রহমান, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক এম. নাহিদ মিয়া এবং কার্যনির্বাহী সদস্য নুরুজ্জামান তালুকদার।

সাক্ষাৎকালে নিসচার পক্ষ থেকে বলা হয়, সড়ক নিরাপত্তা এখন শুধু পরিবহন খাতের বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের পরিবর্তে সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ, পরিবহন খাত এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ সময় নিসচার পক্ষ থেকে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলে সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পসহ সরকারের বিভিন্ন সড়ক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রমে নিসচাকে সম্পৃক্ত করা এবং জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের কর্মসূচিতে সংগঠনের মহাসচিবকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে শক্তিশালী জাতীয় দুর্ঘটনা ডাটাসেল গঠন, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয় এবং তথ্যভিত্তিক নীতি গ্রহণের ওপরও গুরুত্বারোপ করে নিসচা। পাশাপাশি চালক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং পাঠ্যপুস্তকে সড়ক নিরাপত্তা বিষয় অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়। নিসচা আরও প্রস্তাব করে, জাতিসংঘের ‘সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর আলোকে একটি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলে নিয়মিতভাবে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হোক এবং এতে নিসচাকে সম্পৃক্ত রাখা হোক।

বৈঠকে সড়ক, রেল ও নৌপথের নিরাপত্তাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্যে পৃথক একটি কর্মপরিকল্পনাও উপস্থাপন করা হয়। এতে জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠন, রিয়েল টাইম দুর্ঘটনা তথ্য পর্যবেক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, সিসিটিভি ও স্পিড ক্যামেরার ব্যবহার, অটোমেটেড ফাইন ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান দ্রুত সংস্কারের প্রস্তাব রাখা হয়।

পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও অনিয়ম বন্ধ, চালকদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও বিশ্রাম নিশ্চিত, লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস ব্যবস্থায় কঠোরতা, ওভারস্পিডিং ও ওভারলোডিং নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত চালক ডোপটেস্টের বিষয়েও সুপারিশ করা হয়।

রেলপথের নিরাপত্তায় লেভেল ক্রসিংয়ে স্বয়ংক্রিয় গেট ও গেটম্যান, আধুনিক সিগন্যালিং ও ট্র্যাক মনিটরিং এবং অবৈধ রেললাইন পারাপার বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। নৌপথের ক্ষেত্রে ফিটনেসবিহীন নৌযান বন্ধ, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, লাইফ জ্যাকেট ও জরুরি সরঞ্জাম নিশ্চিত এবং ঘাট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাইওয়ে এলাকায় ইমার্জেন্সি রেসপন্স ইউনিট, পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স ও ট্রমা সেন্টার গড়ে তোলার পাশাপাশি নিরাপদ সড়ককে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ গ্রহণের প্রস্তাবও তুলে ধরে নিসচা।

সাক্ষাৎকালে নিসচার ৩৩ বছরের দীর্ঘ পথচলা ও কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত চিত্র মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হয়। নিসচা জানায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি নিজস্ব অর্থায়নে এবং দেশ-বিদেশের প্রায় ১২০টি শাখার মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তায় কাজ করে আসছে। চালক প্রশিক্ষণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সচেতনতা, টার্মিনাল ও রোড ক্যাম্পেইন, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম, সেমিনার-ওয়ার্কশপ, মানববন্ধন, র‌্যালি, গণমাধ্যমে প্রচারণা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সড়কের ঝুঁকি চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগসহ বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করছে সংগঠনটি।

দুর্ঘটনা ও দুর্যোগে মানবিক সহায়তা প্রদান, সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সড়ক নিরাপত্তা সভা ও সেমিনারে অংশগ্রহণ এবং সরকারি বিভিন্ন কমিটি ও রোড সেফটি কোয়ালিশনের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ও মন্ত্রীকে অবহিত করা হয়।

নিসচার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণার ক্ষেত্রেও সংগঠনটির দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও প্রস্তাবনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে সংগঠনটি সড়ক নিরাপত্তাকে আরও কার্যকর ও তথ্যভিত্তিক করার লক্ষ্যে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে আগ্রহী।

নিসচার এসব প্রস্তাব ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করে মন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এমপি বলেন, ছোটবেলা থেকেই নিসচার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে কাজ করার প্রয়াসকে তিনি পছন্দ করেন। নিসচার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগেরও অনেকাংশে মিল রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার অল্প সময়ের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে এআইভিত্তিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ঢাকার বাইরে টার্মিনাল স্থানান্তর এবং ঢাকা শহরকে যানজটমুক্ত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয় উল্লেখ করেন তিনি।

নিসচার উপস্থাপিত প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, তিনি বিষয়গুলো নিজে যাচাই করে দেখবেন এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে নিসচা প্রতিনিধিদের সঙ্গে আবারও বসবেন। সড়ক নিরাপত্তায় নিসচাকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার জন্য তার পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

মন্ত্রী আরও বলেন, নিসচার প্রয়োজন হলে তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতির প্রয়োজন হবে না। প্রয়োজনের সময় তাকে পাওয়া যাবে। নিসচাকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত কাজ করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
বৈঠকে নিসচার পক্ষ থেকে ২২ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, বিআরটিএ ও হাইওয়ে পুলিশকে আরও জনবলসমৃদ্ধ করা, সড়ক নিরাপত্তা আইন দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, পরিবহন শ্রমিকদের বীমা ও তাদের সন্তানদের শিক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং চালকদের নির্ধারিত পোশাক ও পরিচয়পত্র নিশ্চিত করার বিষয়ও তুলে ধরা হয়।

নিসচার পক্ষ থেকে বলা হয়, এসব প্রস্তাব কেবল সুপারিশ নয়, বরং দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, দুর্ঘটনার বাস্তব চিত্র এবং সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে ৩৩ বছরের কাজের ভিত্তিতে তৈরি একটি বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার অংশ। সরকারের নীতিগত সহযোগিতা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ পাওয়া গেলে সড়ক নিরাপত্তার কার্যক্রম আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে।

সাক্ষাৎ শেষে নিসচার পক্ষ থেকে মন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এমপিকে সংগঠনের ৩৩ বছরের পথচলা, আন্দোলন-সংগ্রাম ও কর্মকাণ্ড সংবলিত একটি সুভেনিয়র প্রদান করা হয়। পরে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় শেষ হয়।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : এক পা হারানো অসহায় নার্গিসের পাশে ডিসি ফরিদা

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন