মুরগিকে দ্রুত বড় করার আশায় ফিড কিনেছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের খামারিরা। কিন্তু সেই ফিড খাওয়ানোর পর মুরগির প্রত্যাশিত ওজন না বাড়া, অসুস্থ হয়ে পড়া এবং মারা যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রায় ৩২ জন খামারি ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন তারা।
খামারিদের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে একটি গুদাম থেকে ৮২ বস্তা মুরগির ফিড জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ ঘটনায় ট্রাস্ট কনট্রাক ফার্মের ঠাকুরগাঁও শাখার ব্যবস্থাপক মো. জসিম উদ্দিনকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাকে এক মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। জব্দ করা ফিড সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার জিম্মায় রাখা হয়েছে এবং নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার দক্ষিণ সালান্দর এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
খামারিদের অভিযোগ, সদর উপজেলার দক্ষিণ সালান্দরে রাম বাবুর সারের গুদামের পাশে একটি ভাড়া বাসায় ট্রাস্ট কনট্রাক ফার্মের নামে মুরগির ফিড সংরক্ষণ ও বিক্রি করা হচ্ছিল। দীর্ঘদিন ধরে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ফিড কিনে মুরগি পালন করে আসছিলেন তারা।
তবে সম্প্রতি ওই ফিড খাওয়ানোর পর মুরগির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। অনেক মুরগি অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং অনেক মুরগি মারা গেছে বলেও দাবি খামারিদের। এতে একের পর এক খামারি লোকসানের মুখে পড়েছেন।
সদর উপজেলার শিবগঞ্জ এলাকার খামারি আলী ইমরান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি মুরগির খামার করছেন। ট্রাস্ট কনট্রাক ফার্মের ফিড খাওয়ানোর পর ৩২ দিন পার হলেও মুরগির আশানুরূপ ওজন হয়নি। এতে তার প্রায় ৮৫ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। তার দাবি, তার মতো আরও ৩০ থেকে ৩২ জন খামারি ওই ফিড ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বেগুনবাড়ী রাজাপুকুর বাজার এলাকার খামারি মো. আলী হোসেন বলেন, ট্রাস্ট কনট্রাক ফার্মের ফিড খাওয়ানোর পর তার খামারের প্রায় ৮০০ মুরগি মারা গেছে। এতে তার প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
নতুন উদ্যোক্তা রফিক রাজা বলেন, ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে চাকরির চেষ্টা করেও না পেয়ে তিনি বয়লার মুরগির খামার শুরু করেন। এম.আর. ট্রাস্ট কনট্রাক ফার্ম থেকে ফিড নিয়ে মুরগিকে খাওয়ানোর পর মুরগি অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে অনেক মুরগি মারা যায়। এতে তার প্রায় তিন লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, “নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে শুরুতেই যদি ফিড কোম্পানির কারণে এভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, তাহলে আমরা কীভাবে টিকে থাকব? তাহলে এই দেশে কি করে খাবো?”
আরেক খামারি মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ফিডের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের একাধিকবার জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এখন কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগও করছেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
খামারিদের আরও অভিযোগ, ফিডের বস্তায় উৎপাদনের তারিখ উল্লেখ থাকলেও বস্তায় মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ উল্লেখ করা ছিল না। বিষয়টি নিয়ে কোম্পানির কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করলেও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সমাধান হয়নি বলে দাবি তাদের।
খামারিরা জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর কোম্পানির ম্যানেজার কয়েকটি খামার পরিদর্শন করেন এবং সমস্যার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তারা কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি বলে অভিযোগ করেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ট্রাস্ট কনট্রাক ফার্মের ঠাকুরগাঁও শাখার ব্যবস্থাপক মো. জসিম খান। তার দাবি, ফিডের মান নিয়ে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়।
খামারিদের অভিযোগের পর রোববার বিকেলে দক্ষিণ সালান্দরের ওই গুদামে অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আশাদুল হক অভিযান পরিচালনা করেন।
অভিযানকালে গুদাম থেকে ৮২ বস্তা মুরগির ফিড জব্দ করা হয়। পরে প্রতিষ্ঠানের শাখা ব্যবস্থাপক মো. জসিম উদ্দিনকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আশাদুল হক বলেন, জব্দ করা ফিডগুলো সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। ফিডের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত খামারিরা ক্ষতিপূরণ চাইলে আইনগতভাবে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন।
এদিকে সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান জানান, অভিযানের সময় প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্স, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ফিডের উৎপাদন ও মেয়াদ সংক্রান্ত নথি যথাযথভাবে উপস্থাপন করা যায়নি। ফলে প্রাথমিকভাবে জব্দ করা ফিডের মান ও ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
খামারিদের দাবি, শুধু জরিমানা করেই বিষয়টি শেষ করা যাবে না। নিম্নমানের বা মেয়াদোত্তীর্ণ ফিড বাজারজাতের কারণে যেসব খামারি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তদন্তের মাধ্যমে তাদের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে কোনো প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের বা অনুপযুক্ত ফিড বাজারজাত করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন তারা।
একদিকে মুরগির অস্বাভাবিক মৃত্যু ও ওজন না বাড়ার অভিযোগ, অন্যদিকে নিম্নমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ ফিড বাজারজাতের অভিযোগ—সব মিলিয়ে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা।
পড়ুন : ‘সহজ ধারার’ আশ্বাসে ঘুষ, অডিও ফাঁসের পর শৈলকুপার এসআই তরিকুল প্রত্যাহার


