গত কয়েকদিনে বাংলাদেশে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এরই মধ্যে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। গ্যাস সরবরাহের সংকট দেশের ভঙ্গুর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। তীব্র গরমে সারা দেশে লোডশেডিং সব রেকর্ড ভঙ্গ করছে। ঢাকার বাইরে কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
রোববার বিকেল ৩টায় সারা দেশে লোডশেডিং হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। এমন পরিস্থিতিতে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন জনগণ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, কয়লা ও গ্যাস সংকটের কারণে স্বাভাবিক সময়ের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস। ফলে লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হচ্ছে।
এর আগে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। কিন্তু রোববার বিকেল ৩টায় লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি ও দেশের সব বিতরণ কোম্পানি। অভিযোগ রয়েছে, অনেক এলাকায় সারাদিনে-রাতে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। পিডিবির কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিদ্যুতের এমন পরিস্থিতি আগে খুব বেশি হয়নি।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর হিসাব অনুযায়ী, রোববার বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। বিকেল ৫টায় সরবরাহ কিছুটা বেড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালেও লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট।
পিডিবি জানিয়েছে, আদানির সরবরাহ হঠাৎ করে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। সাধারণ পিক আওয়ারে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট দেওয়া হলেও রোববার বিকেল ৫টায় দেওয়া হয়েছে ৮১৫ মেগাওয়াট। বৈরী আবহাওয়ার কারণে আদানি কয়লা পরিবহন করতে পারছে না। এ কারণে কয়লার মজুতও কমে গেছে। তাই তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বলে পিডিবিকে জানিয়েছে।
তবে তাদের এ তথ্য কতটুকু সত্য, তা যাচাই করতে পারেনি পিডিবি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আপাতত আদানির তথ্য বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় নেই। কারণ সেখানে পরিদর্শনের কোনো সুযোগও নেই।
আদানি ছাড়া কয়লা সংকট ও যান্ত্রিক সমস্যার কারণে বড়পুকুরিয়া, বরিশাল ইলেকট্রিক কোম্পানি, মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপাল, এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার এবং আরএনপিএলের কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। এর মধ্যে পায়রার একটি ইউনিট রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। সেটি রাতে চালু হয়েছে বলে জানা গেছে। এ কারণে পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন হয়েছে ৭১০ মেগাওয়াট।
ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক সক্ষমতা দুর্বল। তাই এর দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ১৬৫ মেগাওয়াট। এসএস পাওয়ারের কয়লার দাম বাড়িয়ে দেওয়ার পরও এর দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ১৬৩ মেগাওয়াট। অথচ এর উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে ৭০ কোটি ঘনফুট। তাই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে কমপক্ষে ২ হাজার মেগাওয়াট।
গতকাল বিকেল ৫টায় দেশের সব গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ৫৮৯ মেগাওয়াট। অথচ এসব কেন্দ্রের সক্ষমতা ১০ হাজার মেগাওয়াট। তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। অথচ এসব কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
পিডিবি জানিয়েছে, গ্যাস সংকটের কারণে কমপক্ষে ২ হাজার মেগাওয়াট এবং কয়লা সংকট ও অন্যান্য কারণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে কমপক্ষে ১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কমেছে। মূলত এ ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ঘাটতির কারণে সারা দেশে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের অন্ধকার নেমে এসেছে।
ভাসমান টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে
এদিকে, ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন ধরে গেলে গ্যাসের সরবরাহ দৈনিক ৫১ কোটি ঘনফুট কমে যায়। এ কারণে সারা দেশে গ্যাস সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক কমে যায়।
টার্মিনালটি মেরামতের পর ৫ আগস্ট রাতে আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। রোববার সন্ধ্যা ৬টায় দেশের দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ৭৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট, যা আগে দেওয়া হতো ১১০ কোটি ঘনফুট।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সবকিছু ঠিক থাকলে আজ সোমবার রাত ১১টার পর এক্সিলারেট এনার্জি পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারে। তবে তা নিশ্চিত নয়। তখন দেশে গ্যাস সরবরাহ দৈনিক ২৬৫ কোটি ঘনফুটে গিয়ে দাঁড়াতে পারে।
সূত্র: যুগান্তর
পড়ুন: আজ এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ
আর/


