গাজীপুর মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল কাশিমপুর। বিপুল জনসংখ্যা, অসংখ্য শিল্পকারখানা ও ঘনবসতির কারণে এ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ পুলিশের জন্য সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জের। মাদক কারবার, সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং, চুরি-ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং বিভিন্ন অপরাধের পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ ও সংঘাত নিয়ন্ত্রণেও পুলিশকে প্রতিনিয়ত মাঠে থাকতে হয়।
এমন বাস্তবতায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কাশিমপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে মোল্লা মো. খালিদ হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ ও পুলিশি তথ্যের ভিত্তিতে মাদক ও অপরাধ দমনে একাধিক অভিযানের চিত্র পাওয়া যায়।
দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে জোর দেওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে আসে। ডিসেম্বর ২০২৫ ও জানুয়ারি ২০২৬—প্রথম দুই মাসের অভিযানের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ সময়ে ১০ হাজার ৭৪৮ পিস ইয়াবা, ২১৪ পিস ট্যাপেন্টাডল ও প্রায় ৩ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে মাদক বিক্রির ৬ লাখ ৪ হাজার ৭৪৫ টাকা জব্দ এবং ৩২ জন মাদক কারবারিকে আইনের আওতায় আনার দাবি করা হয়।
শুধু মাদক নয়, একই সময়ের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ৪৬টি রামদা, বড় ছুরি, সামুরাই ও চাপাতি, পাঁচটি চাকু এবং সাতটি পেট্রোলবোমা উদ্ধারের তথ্যও পুলিশের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়। এসব ঘটনায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
খালিদ হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই কাশিমপুরের লোহাকৈর ও আইস মার্কেট এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে বড় পরিমাণ মাদক উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসে।
১০ ডিসেম্বর ২০২৫-এর অভিযানে ৭ হাজার ৫ পিস ইয়াবা, ২ কেজি গাঁজা, ছিনতাইকৃত মোবাইল ফোন এবং নগদ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫৭০ টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কাশিমপুর থানার তৎকালীন ওসি মোল্লা মো. খালিদ হোসেন জানান, গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ও মামলা ছিল।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃতরা এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আবাসিক হোটেলকেন্দ্রিক অভিযোগের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনার তথ্য পাওয়া যায়।
কাশিমপুরের জিরানীবাজার এলাকার ড্রিমল্যান্ড আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে নারীসহ ৪২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ২৩ জন পুরুষ ও ১৯ জন নারী ছিলেন।
হোটেলটির মালিক ও ব্যবস্থাপনার কয়েকজনকে আটকের কথাও উল্লেখ করা হয়। ওসি খালিদ হোসেন বলেন, তিনি কাশিমপুরে যোগদানের পর থেকেই ওই আবাসিক হোটেল নিয়ে অভিযোগ পেয়ে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিলেন।
এ ধরনের অভিযানকে কাশিমপুরে অপরাধপ্রবণ স্থান ও সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পুলিশের নজরদারির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি বছরের ১১ মে কাশিমপুরের মাধবপুর ও রওশন মার্কেট এলাকায় বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হয়।
সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোনাবাড়ী জোন) আবু নাসের আল আমিনের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে কাশিমপুর থানা পুলিশ অংশ নেয়। অভিযানে ১৫৫ গ্রাম হেরোইন ও ৩ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৬ লাখ টাকা বলে পুলিশ জানায়। এ ঘটনায় ৯ নারীসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানে কাশিমপুর থানার ওসি মোল্লা খালিদ হোসেনসহ থানার একাধিক কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্য অংশ নেন। গ্রেপ্তারদের পরবর্তী সময়ে আদালতে পাঠানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
৩০ জুন রাতে কাশিমপুরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভূমিহীন এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ১০ কেজি ৩৫ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মালেকা খাতুন, আল আমিন কে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রকাশিত পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, মালেকা খাতুনের বিরুদ্ধে এর আগেও আরও পাঁচটি মাদক মামলা ছিল। একই সময়ে বিভিন্ন মামলায় আরও ১০ জনকে আটক করা হয় এবং মোট ১২ জনকে আদালতে পাঠানো হয়।মাদকবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিকতায় জুলাইয়ের শুরুতেই এক রাতে পৃথক তিনটি অভিযান চালানো হয়।
৪ জুলাই মধ্যরাতে পশ্চিম শৈলডুবির কুতুবনগর, সারদাগঞ্জের মুন্সি মার্কেট এবং হাজী মার্কেট পুকুরপাড় এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। এসব অভিযানে ৬ কেজি গাঁজা, ২৮০ পিস ইয়াবা এবং মাদক বিক্রির ১১ হাজার ৭০০ টাকা উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় সাতজনকে আটক করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
এর বাইরে কাশিমপুরে পৃথক অভিযানে ৭৪ গ্রাম হেরোইনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনাও পুলিশের মাদকবিরোধী কার্যক্রমের তালিকায় রয়েছে। উদ্ধার হওয়া মাদক জব্দ করে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা করার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
অপরাধ দমনে শুধু মাদকবিরোধী অভিযান নয়, অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধেও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনা রয়েছে।
২৭ মার্চ সুরাবাড়ী এলাকা থেকে মতিন নামে এক ব্যক্তিকে একটি সাদা প্রাইভেটকারে অপহরণ করে সারদাগঞ্জ এলাকায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। অপহরণকারীরা তাকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল বলে পুলিশ সূত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ওসি মোল্লা মো. খালিদ হোসেন অন্য একটি মামলার আসামিকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে ওই এলাকায় গেলে নির্জন স্থানে প্রাইভেটকার ও সন্দেহজনক ব্যক্তিদের দেখতে পান। পরে ধাওয়া করে অপহৃত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়। অপহরণকারীরা পালিয়ে গেলেও দ্রুত পুলিশের তৎপরতায় ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
কাশিমপুর যেহেতু একটি বড় শিল্পাঞ্চল, তাই কারখানায় সংঘর্ষ ও শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণও পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব। এসব কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কাশিমপুরকে মাদক ও অপরাধমুক্ত করার উদ্যোগ আরও জোরদার হবে—এটাই এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা।
তাদের প্রত্যাশা, অভিযানে শুধু ছোট পর্যায়ের অপরাধী নয়; অপরাধের নেপথ্যে থাকা মূল হোতা, অর্থদাতা, সরবরাহকারী ও পৃষ্ঠপোষকদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও আইনসম্মত তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
কাশিমপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের এই ধারাবাহিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলে শিল্পাঞ্চলটির নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের পুলিশের প্রতি আস্থা আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পড়ুন : কক্সবাজারে পৃথক অভিযানে অস্ত্র-গোলাবারুদসহ ৬ লাখ ইয়াবা জব্দ


